
মাস্টার্স শেষ করে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ন করছিলেন তৌহিদুল ইসলাম। যৎসামান্য বেতনে ঢাকা শহরে টিকে থাকা যখন দায় হয়ে পড়েছিল, তখনই সিদ্ধান্ত নেন রাইড শেয়ারিংয়ের। নিজের জমানো কিছু টাকা আর ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে ধার নিয়ে কেনা মোটরসাইকেলটিই এখন তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। তৌহিদুল বলেন, ‘আগে চাকরির পেছনে ছুটতাম। এখন আমি নিজেই নিজের বস। পাঠাও-উবারে রাইড দিয়ে মাসে খরচ বাদে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা অনায়াসেই থাকে, যা দিয়ে পরিবার সামলে নিজেও ভালো আছি।’
তৌহিদুলের মতো হাজার হাজার তরুণের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা। পাঠাও, উবার ও ওভাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শুধু যাতায়াত সহজ করেনি, বরং বেকার ও অর্ধবেকার তরুণদের জন্য একটি কার্যকর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সীমিত চাকরির বাজারে এই খাত এখন অনেকের জন্য আশার নাম।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ও প্ল্যাটফর্মের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে সক্রিয় ও খণ্ডকালীন মিলিয়ে রাইড শেয়ারিং চালকের সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। এই খাতের বার্ষিক আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ দুই হাজার পাঁচশ কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। গড় হিসাবে একজন চালক মাসে ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। কাজের সময়, এলাকা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই আয়ের পরিমাণ আরও বাড়তেও পারে। পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের ধারণা দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। প্রচলিত চাকরির বাইরে নিজের সুবিধামতো সময়ে কাজ করার সুযোগ তরুণদের কাছে এই পেশা আকর্ষণীয় করে তুলেছে। অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখার পাশাপাশি রাইড শেয়ারিং করে নিজের খরচ চালাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ প্রাথমিকভাবে খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে শুরু করে এটিকেই পূর্ণকালীন পেশায় রূপ দিচ্ছেন।
রাইড শেয়ারিংয়ের একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো তুলনামূলক কম পুঁজিতে কাজ শুরু করার সুযোগ। একটি মোটরসাইকেল, বৈধ লাইসেন্স ও স্মার্টফোন থাকলেই আয়ের পথে নামা যায়। পাশাপাশি স্মার্টফোন অ্যাপ, মানচিত্র ব্যবহার এবং ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হওয়ার ফলে চালকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতাও বাড়ছে। এতে তাদের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ছে।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে। নিরাপত্তা নিয়ে যাত্রী ও চালক– উভয় পক্ষেরই উদ্বেগ রয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, এখন অধিকাংশ রাইডার অ্যাপে যেতে চান না। চালকদের একটি অংশের অভিযোগ, অ্যাপভিত্তিক কমিশনের হার তুলনামূলক বেশি হও৮য়ায় আয়ের ওপর চাপ পড়ে। ফলে অনেকেই অ্যাপ ছাড়াই যাত্রী নেন। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং নগরীর যানজটও আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক সময় সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা হয়রানির অভিযোগও শোনা যায়।
উবার ও পাঠাও প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে। জিপিএস ট্র্যাকিং, পরিচয় যাচাই, জরুরি সহায়তা এবং বীমা সুবিধা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি চালকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাইড শেয়ারিংয়ের প্রভাব শুধু চালকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মোটরসাইকেল বিক্রি, মেরামত গ্যারেজ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও সুরক্ষা সরঞ্জামের বাজারও এই খাতের কারণে সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক বহুগুণ প্রভাব তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুশৃঙ্খল নীতিমালা, চালক সুরক্ষা এবং ন্যায্য কমিশন কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে রাইড শেয়ারিং খাত ভবিষ্যতে দেশের বেকারত্ব নিরসন ও নগর পরিবহন ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।







































