
ছেলেমেয়েদের আবদার মেটাতে খেজুরের গুড় কিনতে আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী বাজারের মিঠাই গলিতে গিয়ে সিফাতুল্লাহর চোখে পড়ে দামের বিস্তর ফারাক। এক বিক্রেতা দুটি গুড় দেখান। একটি গুড়ের দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, আরেকটির দাম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। সিফাতুল্লাহ দাম কমবেশির কারণ জানতে চান। বিক্রেতা হানিফ বলেন, খাঁটি গুড় কম দামে বিক্রি সম্ভব না। কেউ কেউ চিনি, রঙ ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে ভেজাল গুড় বানাচ্ছে।
গোপালদী বাজারে গুড় কিনতে আসা গৃহিণী রাবেয়া বেগম বলেন, আগে চোখ বন্ধ করে গুড় কিনতাম। এখন ভয় লাগে। রঙ বেশি চকচকে হলে সন্দেহ হয়, আবার কম দামের গুড় মানেই ভেজালÑ এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল গুড়ে ব্যবহৃত কৃত্রিম রঙ ও রাসায়নিক নিয়মিত গ্রহণ করলে হজমজনিত সমস্যা, অ্যালার্জি এবং দীর্ঘমেয়াদে অন্যান্য জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া একটি গুড় ‘খেজুর গুড়’ বলে দাবি করেন বিক্রেতা। তবে গুড়টি হাতে নিয়ে ভাঙতেই গুঁড়ো হয়ে যায়, যা খাঁটি খেজুর গুড়ের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে না। রান্না করার পর এতে কোনো স্বাভাবিক খেজুরের ঘ্রাণ পাওয়া যায়নি; বরং পোড়া চিনির গন্ধ পাওয়া গেছে। গুড় কিনতে আসা গৃহিণী আফিয়া রহমান বলেন, দেখতে ভালো, দামও কমÑ তাই কিনেছিলাম। বাসায় এনে পায়েস রান্নার পর গন্ধে বুঝেছি এটা গুড় না, চিনি দিয়ে বানানো কিছু।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে চিনি গলিয়েই গুড় তৈরি করা হয়। বড় হাঁড়ি বা ড্রামে চিনি ও পানি জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়, এরপর সেটিকে গুড়ের মতো আকার দেওয়া হয়। এতে খেজুরের কোনো রস না থাকলেও বাইরে থেকে দেখতে গুড়ের মতো হওয়ায় সাধারণ ভোক্তা সহজে বুঝতে পারেন না। গুড়ের রঙ ও আকর্ষণ বাড়াতে বিভিন্ন রাসায়নিক ও কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়। পোড়া তেল, কেমিক্যাল রঙ বা কখনও কখনও ফিটকিরি, বেকিং সোডা ও হাইড্রোজ (সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট) ব্যবহার করে গুড়কে উজ্জ্বল বা হালকা রঙের করা হয়। এসব উপাদানে গুড়কে চকচকে দেখালেও এর স্বাভাবিক রসালো ভাব নষ্ট হয়ে যায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে সাত হাজার কেজির বেশি ভেজাল গুড় জব্দ করা হয়েছে এবং জরিমানা আদায় হয়েছে অন্তত ১১ লাখ টাকা।
চলতি মাসে ঢাকার ধামরাইয়ে ভেজাল গুড় উৎপাদনকারী একটি কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করে র্যাব। র্যাব জানায়, কারখানায় চিনি, চিটাগুড়, হাজার পাওয়ারের রঙ ও বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করে ভেজাল গুড় উৎপাদন করে আসছিল। পরে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
খাদ্য নিরাপত্তা আইন-২০১৩ অনুযায়ী ভেজাল বা ক্ষতিকর খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা নিষিদ্ধ। এ আইনে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে।
ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক বিপুল বিশ্বাস বলেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা এমন কর্মকাণ্ড সারা বাংলাদেশেই করে যাচ্ছেন। তাদের ধরতে আমরা প্রতিনিয়তই অভিযান পরিচালনা করছি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, শীতকালে গুড়ের চাহিদা বাড়লেই একশ্রেণির ব্যবসায়ী মৌসুমি লাভের আশায় গুড়ের বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার লোভে ভেজাল গুড় উৎপাদন ও বিক্রি বাড়িয়ে দেয়। বাজার তদারকিতে শৈথিল্যে ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নজরদারির অভাবে ভেজালকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল ও চা প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মোজাম্মেল হক বলেন বিশুদ্ধ খেজুরের গুড় শরীরের ক্যালসিয়াম ও আয়রন ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। তবে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী গুড়ে ময়দা, বালু ও মাটি মিশিয়ে ওজন বাড়ায়, কাপড়ের রঙ মিশিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলে। ভেজাল গুড় পাকস্থলী নষ্টসহ নানা রোগের কারণ হতে পারে।
কিছু সহজ লক্ষণ ও ঘরোয়া পরীক্ষার মাধ্যমে খাঁটি ও ভেজাল গুড় আলাদা করা সম্ভব। খাঁটি খেজুর গুড়ের রঙ সাধারণত গাঢ় বাদামি বা কালচে লাল হয়। এটি স্বাভাবিকভাবে খুব বেশি চকচকে নয়। যদি গুড়ের রঙ অতিরিক্ত হলুদ, উজ্জ্বল বা অস্বাভাবিকভাবে ঝকঝকে হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে এতে রাসায়নিক বা কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। আসল খেজুর পাটালি হাত দিয়ে চাপ দিলে নরম অনুভূত হয় এবং ভেতর থেকে হালকা রস বের হয়। পাটালির ওপরের অংশ কিছুটা শক্ত হলেও ভেতরের অংশ সবসময় রসালো থাকে। ভেজাল পাটালি সাধারণত খুব শক্ত, শুকনো ও অতিরিক্ত চকচকে হয়। খাঁটি গুড়ের স্বাদ মিষ্টির সঙ্গে হালকা ঝাঁজ বা তিতকুটে ভাব থাকে, ভেজাল গুড়ে শুধু চিনির মিষ্টি পাওয়া যায়, কোনো ঝাঁজ থাকে না। এক গ্লাস পানিতে গুড় দিলে খাঁটি গুড় ধীরে গলে পানি হালকা লালচে বা বাদামি রঙ ধারণ করে। ভেজাল গুড়ে পানি দুধের মতো সাদা হয়ে যায় বা সাদা স্তর ভাসে।





























