
জাহিদ হাসান মুক্তার, পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: পাকুন্দিয়া উপজেলায় বিল্ডিং নির্মাণ শ্রমিকদের জিনিসপত্র জব্দ করে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় শ্রমিক ইউনিয়নের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে। এছাড়াও বিল্ডিং মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি, কাজ ফেলে রেখে কাজের সম্পুর্ন টাকা নিয়ে কাজ না করে মালিক পক্ষকে হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে ।গত মে দিবসে ভুক্তভোগী কয়েকজন শ্রমিক জানান, তারা যথারীতি সে দিন নির্মাণ কাজে যোগ দিলে কিছু লোক এসে নিজেদের শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি পরিচয় দেয়। এরপর ‘মে দিবস উপলক্ষে কাজ করার কোন অনুমতি নাই’ দাবি করে নগদ টাকা চায়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামদি জব্দ করে অফিসে নিয়ে যায় । ইয়াসিন নামে এক শ্রমিক বলেন, “আমরা তো দিন এনে দিন খাই। মে দিবসে যেখানে আমাদের সম্মানিত করার কথা, সেখানে আমাদের কাজ বন্ধ করে দিয়ে উল্টো টাকা দাবি করা হচ্ছে!”এ বিষয়ে স্থানীয় বিল্ডিং নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের কোদালিয়া বাজারে অবস্থিত চন্ডিপাশা আঞ্চলিক শাখার সভাপতি আনোয়ার হোসেন শরীফ বলেন, “আমি রোগী নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম। আমরা মে দিবসে কোন চাঁদা তুলি না, তবে শুনেছি আমাদের কিছু লোক গিয়ে মে দিবস উপলক্ষে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আর টাকা পয়সার কথা বলে থাকলে এটা ঠিক করেনি”কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের পরিচয়ে বিভিন্ন নির্মাণ সাইটে গিয়ে কাজ বন্ধ করে তাদের সরঞ্জামাদি কোদালিয়া বাজারে অবস্থিত অফিসে নিয়ে এসেছে। জরিমানা দিয়ে সেগুলো ফেরত নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে । কিছু নির্মাণ শ্রমিকের দাবি তাদের সংগঠনের লোক ব্যতীত বা তাদের অফিসের পরিচয়পত্র বহনকারী ব্যতীত অন্য কোন নির্মাণ শ্রমিক সেই এলাকায় কাজ করলে সেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার তাদের সংগঠনের কার্ডধারী অনেক লোক আছে এলাকায় বিল্ডিং নির্মাণের কাজ মৌখিক চুক্তিতে নিয়ে অর্ধেক বা তার চেয়েও কম কাজ করে পুরো টাকা নিয়ে যায়। বাকী কাজ করে না। এতে বিল্ডিং মালিক পক্ষ হয়রানির শিকার হয়ে তাদের ধারে ধারে ঘুরেও কোন সুফল পায় না। কারন অফিসে শালিসের আয়োজন করে তারাই বিচার করে বিল্ডিং মালিককে জরিমানা ধরে।কোদালিয়া গ্রামের ভুক্তভোগী আব্দুল মোতালিব বলেন - দুই বছর আগে লাল মিয়া ও রতন মিয়া নামের ২ জন রাজ মিস্ত্রিকে ৩ বছর মেয়াদি ২২২.৫০ টাকা স্কয়ার ফুট হিসেবে (বিল্ডিং এর ছাদের হিসেবে) আমার বিল্ডিং এর কাজ দেই। কাজের মোট মজুরি ছিল ৬ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু তারা ২ বছর কাজ করে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। এখনও প্রায় অর্ধেক কাজ বাকি। তারা আর কাজে আসেনা। অনেক ঘোরাঘুরির পর গ্রাম্য শালিসে সিদ্ধান্ত হয় আমাকে আরো ১ লক্ষ টাকা রাজ মিস্ত্রি কে দিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু পরে কোদালিয়া বাজারের শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও ক্যাশিয়ার আমার কাছে আরো ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে আমি অতিরিক্ত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করি। একই গ্রামের অলি উল্লাহ'র স্ত্রী জানান, প্রায় দুই বছর আগে আমার স্বামী দেশে থাকা অবস্থায় লাল মিয়া ও রতন মিয়া কে আমাদের ১৮শ স্কয়ার ফিট বিল্ডিং এর কাজ দেই। ১ বছরে তিন ভাগের এক ভাগ কাজ করে সম্পুর্ন টাকা নিয়ে যায়। পরে আর তারা কাজে আসেনা। পহেলা রমজান মাস থেকে কাজ করবে বলে বিল্ডিং এর মালামাল কিনে আনতে বলে।পরে আর তারা কাজে আসে নাই। তারা না আসায় আমার ১৭ ব্যাগ সিমেন্ট নষ্ট হয়ে যায়। পরে যোগাযোগ করা হলে তারা বলে অন্য মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে। বাধ্য হয়ে এখন অন্য মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের কাছে জানতে রাজমিস্ত্রী লাল মিয়ার মোবাইল নম্বরে একাধিক বার কল দিলেও সে কল রিসিভ করেনি।এ বিষয়ে কোদালিয়া বাজারে অবস্থিত শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রঞ্জুর সাথে কথা বলে জানা গেছে -"লাল মিয়া তাদের সংগঠনের একজন সাধারণ সদস্য। তাকে প্রশ্ন করা হয় যে,কোদালিয়া গ্রামের আব্দুল মোতালিব এর বিল্ডিং এর কাজ না করে পুরো টাকা নিয়ে আসছে,এ বিষয়ে আপনাদের পদক্ষেপ কি? এ বিষয়ে রঞ্জু বলেন, "উভয় পক্ষের সাথে আমরা কথা বলেছি, কিন্তু মালিক পক্ষ আরো এক বছর সময় চায়,তাই আর কোন সমাধান করা সম্ভব হয়নি।"তবে মালিক পক্ষের অভিযোগ, গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে লাল মিয়াকে- মালিক পক্ষ ১ লক্ষ টাকা দিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কাজটা করে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এতে উভয় পক্ষ সিদ্ধান্ত মেনে নেয় ।কিন্তু পরে কোদালিয়া বাজারে অবস্থিত শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং কোষাধ্যক্ষ মিলে আরো ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দাবি করেছেন।এমন প্রশ্নের জবাবে সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রঞ্জু বলেন - "এটা তো আমরা বইল্লা করছি না,এটা তাদের সুবিধার্থে আমরা বলছি,এটা সব আপনার এখতিয়ারী।যেহেতু আপনারই আত্মীয় স্বজন,আপনার এলাকার মানুষ কাজ করছে, প্রায় আপনার আড়াই লক্ষ টাকা লাগে শেষ করতে। এহন ১ লক্ষ টাকা আপনি খুশি হয়ে দিছেন। হয়তো আর ২০/৩০ হাজার টাকা যদি তাকে দেন,তাহলে হয়তো তার পকেট থেকে ভরে হলেও কাজটা শেষ করতে পারবে। আর সাবেক দরবারের উপরে আমরা কোন কথা বলিনি। জাস্ট মালিক পক্ষকে সুপারিশ করেছি।"কিশোরগঞ্জ জেলা নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বকস্ এর সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি বলেন - "কিশোরগঞ্জ জেলা নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন ১৯৮৯ সনে রেজিষ্ট্রেশন পেয়েছে। এর অধিনে কিশোরগঞ্জে আনুমানিক ১৫/১৬ টা শাখা অফিস রয়েছে। আরো ২ অফিস প্রক্রিয়াধীন। আমরা মুলত মালিক- শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।আমাদের সংগঠনের কোন কার্ডধারী শ্রমিক যদি নিয়ম বহির্ভূতভাবে মালিক পক্ষকে কোন কাজ নিয়ে হেনস্তা করে বা কাজ ফেলে রাখে তাকে আমরা বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাই।আবার কোন শ্রমিক যদি কোন সমস্যার সম্মুখীন হয়,তাও আমরা সমাধানের চেষ্টা করি।এ ব্যাপারে পাকুন্দিয়া থানার ওসি বলেন,“এ লিখিত কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”এলাকার সচেতন মহলের মতে, এই ধরনের চাঁদাবাজি শ্রমিক আন্দোলনের চেতনাকে অপমানিত করে এবং একটি সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন দিয়ে জেলা,উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে আনাচে-কানাচে অফিস দিয়ে সাধারণ জনগণ চাঁদাবাজি বা হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে অবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার দিনে যদি তারাই হয়রানির শিকার হন, তাহলে প্রশ্ন উঠবে ইউনিয়নের কার্যক্রম ও উদ্দেশ্য নিয়ে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি।





























