
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যে বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়ে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল সেটির সাংকেতিক নাম বা কোড নেম দিয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এক রাতের ওই হামলায় অন্তত অর্ধ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। ওই রাতকে স্বাধীন বাংলাদেশে বর্ণনা করা হয় ‘কালরাত’ হিসেবে। বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, অভিযানের উদ্দেশ্য হিসেবে দুটি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছিল, ‘শেখ মুজিবের ডিফ্যাক্টো শাসনকে উৎখাত করা এবং সরকারের (পাকিস্তান) কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।’
পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর বর্বরোচিত হামলায় সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল। অভিযানের প্রধান তিনটি লক্ষ্যবস্তু ছিল-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদর দফতর এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স।
ওই কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ছিল অগণন মরদেহ। সেই ভয়াল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়। বহু ছাত্রকে হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযান কতটা নৃশংস ছিল, জগন্নাথ হলের ক্যান্টিনের কর্মী সুনীল কুমার দাস তার বিবরণে বলেছিলেন, ‘সেদিন (জগন্নাথ হলের) শহিদ মিনারের পাশে কত লোকের যে লাশের সারি ছিল, তার কোনো হিসাব নেই। হল থেকে ছাত্রদের, হলের শিক্ষক-কর্মচারীদের হত্যা করে মরদেহ এনে কবর দেওয়া হয়। আমিসহ চারজন কর্মচারী একটা ড্রেনে লুকিয়ে ছিলাম। আমরা পরদিন সকালে পালিয়ে যেতে সক্ষম হই।’
সময়টা ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করায় ঢাকা তখন বিক্ষোভের শহর। ঢাকায় উড়ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। ডামি রাইফেল নিয়ে ঢাকার রাস্তায় মার্চ করেছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। ঢাকায় তখন চলছে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক। আলোচনায় অংশ নিতে জুলফিকার আলী ভুট্টোও রয়েছেন শহরে। সব মিলে খুবই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। এরকম প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযান চালিয়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ২৫ মার্চ রাতের ওই সেনা অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল তারও এক সপ্তাহ আগে, ১৮ মার্চ।
মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বিভীষিকাময় রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে ৭০০০ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হয় আরও ৩০০০ লোক। ঢাকায় ঘটনার মাত্র শুরু হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা চালাতে লাগল আর বাড়তে থাকল মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করল ঘর-বাড়ি, দোকানপাট। লুট আর ধ্বংস যেন তাদের নেশায় পরিণত হলো। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শিয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠল শকুনতাড়িত শ্মশানভূমি।’
কালরাতের সেই ভয়াবহ সেনা অভিযানের পরিকল্পনা কীভাবে হয় তার ধারণা পাওয়া যায় সে সময় ঢাকায় দায়িত্বরত পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা থেকে। মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা তখন পূর্ব পাকিস্তানের ১৪তম ডিভিশনের জিওসি ছিলেন। সামরিক অভিযান অপারেশন সার্চলাইটের অন্যতম পরিকল্পনাকারী তিনি। ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওউন কান্ট্রি : ইস্ট পাকিস্তান, ১৯৬৯-১৯৭১’ শিরোনামের তার স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে তিনি লিখেছেন-১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান টেলিফোনে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এবং মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজাকে কমান্ড হাউসে ডেকে পাঠান। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান গভর্নরের উপদেষ্টা। দুজন সেখানে যাওয়ার পর টিক্কা খান তাদের বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আলোচনায় ‘প্রত্যাশিত অগ্রগতি’ হচ্ছে না। যে কারণে এখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মিলিটারি অ্যাকশনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। আর সে কারণে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী ১৮ মার্চ সকাল থেকে ক্যান্টনমেন্টে খাদিম হুসাইন রাজার বাসায় রাও ফরমান আলী এবং তিনি দুজন মিলে অপারেশন সার্চলাইটের খসড়া তৈরি করেন।
খাদিম হুসাইন রাজা লিখেছেন, ১৮ মার্চ সকালে তিনি তার স্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন যাতে তিনি তার বাঙালি এডিসিকে ব্যস্ত রাখেন এবং তার অফিস থেকে দূরে রাখেন। যেন রাও ফরমান আলী সকাল সকাল খাদিম হুসাইন রাজার অফিসে কী করছেন সে সন্দেহ বাঙালি এডিসির মনে উদয় না হয়। সারা সকাল ধরে জেনারেল রাজা এবং জেনারেল আলী সামরিক অভিযান পরিচালনার খসড়া তৈরি করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা দুজন পরিকল্পনার পরিসর নিয়ে একমত হন, এরপর দুজনে দুটি আলাদা পরিকল্পনা লেখেন। ঢাকা অঞ্চলে সামরিক অপারেশনের দায়িত্ব নেন রাও ফরমান আলী, আর বাকি পুরো প্রদেশে অভিযানের দায়িত্ব নেন খাদিম হুসাইন রাজা।
রাও ফরমান আলী পরিকল্পনায় তার অংশে একটি মুখবন্ধ লেখেন এবং কীভাবে ঢাকায় অপারেশন চালানো হবে তা বিস্তারিত লেখেন। ঢাকার বাইরে বাহিনীর কী দায়িত্ব, কীভাবে পালন করবে তার বিস্তারিত পরিকল্পনা করেন খাদিম। সন্ধ্যায় খসড়া পরিকল্পনা নিয়ে তারা হাজির হন কমান্ড হাউসে। খাদিম হুসাইন রাজা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন এবং কোনো আলোচনা ছাড়াই পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সিদ্দিক সালিক। ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ শিরোনামের একটি বইয়ে তিনি অপারেশন সার্চলাইট নিয়ে লিখেছেন-জেনারেল রাও ফরমান আলী হালকা নীল কাগজের অফিসিয়াল প্যাডের ওপর একটি সাধারণ কাঠ পেন্সিল দিয়ে ওই পরিকল্পনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, তিনি স্বচক্ষে সেই হাতে লেখা পরিকল্পনার খসড়া দেখেছিলেন। তাতে সামরিক অভিযানের প্রাথমিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, শেখ মুজিবের ডিফ্যাক্টো শাসনকে উৎখাত করা এবং সরকারের (পাকিস্তানের) কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিকল্পনা ছিল ১৬টি প্যারা সংবলিত এবং পাঁচ পৃষ্ঠা দীর্ঘ।
পরিকল্পনা অনুমোদিত হলেও কবে সামরিক অপারেশন চালানো হবে সেই দিনক্ষণ নির্ধারিত ছিল না।ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেশের বিভিন্ন ব্যারাকে ঘুরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা তদারকি করলেও, অপারেশন সার্চলাইটে অংশ নেওয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর কারও কাছেই কোনো লিখিত অর্ডার পাঠানো হয়নি। সময় জানিয়ে মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইনের কাছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের কাছ থেকে ফোনটি এসেছিল ২৫ মার্চ বেলা ১১টায়। সংক্ষেপে বলা হয়েছিল, ‘খাদিম, আজ রাতেই।’ সময় নির্দিষ্ট হয়েছিল রাত ১টা। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেবে অবশ্য তখন থাকবে ছাব্বিশে মার্চ। হিসাব করা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ততক্ষণে নিরাপদে করাচি পৌঁছে যাবেন।
স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও ওই সময়কার গণহত্যার অনেক ঘটনা এখনও উন্মোচিত হয়নি। গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনও মেলেনি। ২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গণহত্যাকাণ্ডের দিনটি জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।







































