
নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। রোববার (১৩ এপ্রিল) সকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
জানা গেছে, সকাল সাড়ে ১০টায় জাকির খান কারাগার থেকে মুক্ত হলে তার আত্মীয়-স্বজন ও নেতাকর্মীরা জেলগেট থেকে ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। এ সময় তিনি বিএনপি ও ফিলিস্তিনের পতাকা নেড়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। পরে নেতাকর্মীদের নিয়ে পুরো শহরে শোডাউন দেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ ফোরকান ওয়াহিদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, একটি মামলায় পাঁচ বছরের সাজার মেয়াদ শেষ হলে জাকির খানকে মুক্তি দেওয়া হয়।
জাকির খানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম বলেন, জাকির খানের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা ছিল। এর মধ্যে ৩২টিতে তিনি খালাস পেয়েছেন। বাকি একটি মামলায় তিনি জামিনে আছেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক আগে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী একটি মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় আজ তিনি সাজা শেষ করে মুক্তি পেয়েছেন।
উল্লেখ্য, হত্যা মামলাসহ মোট ৩৩টি মামলার আসামি ছিলেন জাকির খান। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর ২০২২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর র্যাব-১১ এর একটি অভিযানে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন মামলায় জামিন পান তিনি। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি সাব্বির আলম হত্যা মামলার রায়ে তিনি খালাস পান।
জাকির খান ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতি গুরু জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি প্রয়াত নাসিম ওসমানের বিরোধ বাঁধে। পরে জাকির খান বিএনপি নেতা কামালউদ্দিন মৃধার নেতৃত্বে ১৯৯৪ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৫ সালে দেওভোগ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী দয়াল মাসুদকে শহরের সোনার বাংলা মার্কেটের পেছনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে শহরে পরিচিত পান জাকির খান। ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষ দিকে জাকির খান শহরের খাজা সুপার মার্কেটে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়ে জেলে যান। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় তিনি মুক্ত হন। সে সময়ের বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর নাতি হিসেবে শহরে পরিচিত হয়ে ওঠেন জাকির খান।
একই বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মাথায় কাশীপুর বাংলাবাজার এলাকায় এক ঠিকাদারের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা হয়। এই মামলায় দ্বিতীয় দফায় জাকির খানের পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। এরপর আওয়ামী লীগের চার বছর ক্ষমতার সময় জাকির খান কারাবন্দি থাকেন। ১৯৯৯ সালে স্বল্প সময়ের জন্য জেল থেকে বের হয়ে জাকির খান জেলা ছাত্রদলের সভাপতির পদটি পেয়ে যান। আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষ দিকে ২০০০ সালে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ থেকে টানবাজার ও নিমতলী পতিতালয় উচ্ছেদ করলে জাকির খানের পরিবারের ‘অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড’ ভেঙে যায়। ২০০১ সালে বিএনপির চারদলীয় জোটের ক্ষমতায় আসার পরও প্রায় পাঁচ মাস জাকির জেলে থাকেন।
২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রয়ারি তৎকালীন বিকেএমইএর সহসভাপতি সাব্বির আলম খন্দকারকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছিলেন জাকির খান। তিনি দেশ ছেড়ে পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারি হয়। এর জের ধরে দীর্ঘ ২১ বছর ২০২২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর দেশে ফিরে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন জাকির খান। এর পর থেকে তিনি একাধিক মামলায় আদালতে চলমান হওয়ায় ৯৫২ দিন কারামুক্তি পেলেন রোববার।
রাজনীতি জীবনে জাকির খান ছিলো আলোচিত। একাধিক সূত্রে জানা যায়, সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা ও মামলা দায়ের করা পর বিএনপির হাইকমান্ড জাকির খানকে আত্মসমর্পনের নিদের্শনা দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু ওই সময়ে ক্লিন হার্ট অভিযানে ক্রস ফায়ার ভয়ে তিনি থাইল্যান্ডে দীর্ঘ বছর সময় পাড় করেন। এতে হাইকমান্ড নাখোশ হওয়ায় ১৯৯৯ সালে তিনি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি থেকে আর কোন পদ পায়নি দলের। গত দুই বছর যাবৎ তার সমর্থকরা মহানগর বিএনপি সভাপতি পদ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ বা ৫ আসনে বিএনপির এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে প্রচারণা ও বক্তব্যে দিয়ে যাচ্ছে। জাকির নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি একজন সদস্য না হয়েও তার স্বজনরা যুগ্ম আহবায়ক হয়েছেন। তার ছোট ভাই জিকু খান জাসাস নারায়ণগঞ্জ সদর থানা শাখার সভাপতি হয়েছেন। আরেক ছোট ভাই মামুন খান মৎসজীবী দলের সাথে জড়িত রয়েছেন।
আদালতপাড়ায় জাকির আসলে এক সময় গডফাদার খ্যাত নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শামীম ওসমানও ভয় পেতেন। প্রকাশ্যে সভা সমাবেশেই শামীম ওসমান বলতেন দেশের মধ্যে কাউকে ভয় পাই না। গালি দিয়ে বলতেন আমি একমাত্র জাকির খানকেই ভয় পাই।





























