
ক্ষমতাসীন দলের মূল শক্তি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। তবে সম্মেলন হলেও কমিটির মেয়াদ শেষের পর এই দুই সিটির থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের নতুন কমিটি গঠন করা হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একাধিকবার নতুন কমিটি গঠনে তাগাদা দিলেও দুই সিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের দ্বন্দ্বে তৃণমূলে কমিটি গঠন করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি দলের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নির্দেশনা দিয়েছেন তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলন হয়ে যাওয়া এলাকায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে। তারপরও টনক নড়ছে না ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ সিটির আওয়ামী লীগ নেতাদের।
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর। ওইদিন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নাম ঘোষণা করা হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর। নিয়ম অনুযায়ী ২০২২ সালের নভেম্বরে মূল কমিটির সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত হয়নি। তবে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ৮০২টি ইউনিট, একটি ইউনিয়ন, ৬৪টি ওয়ার্ড ও ২৬টি থানায় সম্মেলন হয়েছে। কিন্তু কোথাও কমিটি গঠন করা হয়নি।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অধীনে ২৪টি থানা, ৭৫টি ওয়ার্ড, ৫টি ইউনিয়ন এবং ৪০০টি ইউনিট রয়েছে। এরমধ্যে ইউনিটগুলোয় প্রথমবারের মতো সম্মেলন করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত থানা ও ওয়ার্ডের কমিটি গঠন করা হয়নি। জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াতের যেকোনো কর্মসূচির বিপরীতে মাঠে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। কিন্তু এই দুই নগর আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে শক্তিহীন হয়ে পড়ছে। কারণ এই দুই নগর আওয়ামী লীগের মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি গঠন করতে পারেনি। তবে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের সম্মেলন হয়েছে। কমিটি না দেওয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। ফলে দুই নগর আওয়ামী লীগ কর্মসূচি দিলেও থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের নেতাকর্মীরা তাতে অংশগ্রহণ করছেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি গঠনের আগে দুই নগর আওয়ামী লীগ চাচ্ছে প্রথমে নিজের সম্মেলন করতে। সেখানে নতুন যে কমিটি হবে তারাই পরে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি গঠন করবে।
এ নিয়ে ইতিমধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলেছেন দুই নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা। তারা থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি গঠন না করে দায় এড়িয়ে যেতে চাইছেন। কারণ নিজেদের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এই মুহূর্তে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি গঠন করে বাড়তি সমস্যায় জড়াতে চাইছেন না।
ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২২ সালের নভেম্বরে। কিন্তু থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটিগুলো এখনও দেওয়া হয়নি। কারণ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কমিটির মধ্যে রয়েছে মতবিরোধ। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির তাদের পকেট কমিটি করতে চান। আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক একাধিকবার তাগাদা দিলেও থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি গঠন করতে গড়িমসি করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি নিজস্ব লোক দিয়ে পকেট কমিটি করতে চাইছেন। এতে তাদের মধ্যে মনোমানিল্য সৃষ্টি হওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। ফলে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ যখন কোনো কর্মসূচি দেয়, তখন নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কম হয়। যদিও দুই নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা বলছেন, আগামী মার্চের শেষ নাগাদ থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের আওতাধীন ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল বলেন, আমাদের ডেমরা থানা আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন আগেই সম্মেলন করেছি। কিন্তু কমিটি গঠন করা হয়নি। আমি অনেক আগেই সভাপতি পদে জীবন বৃত্তান্ত জমা দিয়ে রেখেছি। কমিটির কথা নেতাদের কাছে বললে তারা বলেন, এই দিচ্ছি, দেব। এতে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ফলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ কর্মসূচি ডাকলে কেউ যেতে চায় না।
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান বলেন, দল থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সম্মেলন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার। থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের সম্মেলন হয়েছে। নিজেদের মধ্যে কিছু জটিলতায় কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এ ছাড়া গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সবাই ব্যস্ত ছিলেন। তবে আমরা কাজ করছি, আগামী মার্চের শেষ নাগাদ কমিটিগুলো ঘোষণা করা হবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী বলেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার নির্দেশনা দিয়েছে। কমিটি গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। কবে ঘোষণা করতে পারব এখনই বলতে পারছি না। কারণ কমিটি নিয়ে বেশ জটিলতা আছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, এখনই বলতে পারছি না কবে নাগাদ থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের নতুন কমিটি গঠন করতে পারব। তবে কাজ চলছে।
নাম প্রকাশ না করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এক সহ-সভাপতি বলেন, দক্ষিণের সভাপতি আবু আহম্মেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির তাদের নিজস্ব বলয়ের লোক দিয়ে কমিটি দিতে চান। আমাদের কিছুই জানানো হয় না। এ নিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে মনোমানিল্য চলছে। ফলে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি ঘোষণা করতে পারছেন না। এখন তারা চাইছেন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না দিয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্মেলন করতে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কাছে এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের থানার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের একাধিক প্রার্থী বলেন, আমরা অনেক আগেই জীবন বৃত্তান্ত জমা দিয়েছি। কিন্তু থানার কমিটি দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। ফলে কোনো কর্মসূচি ডাকলেও নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কম থাকে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, ঢাকার থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের সমম্মেলন হলেও কমিটি দিতে পারেনি ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে দলের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। আমাদের কাছে তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা এসে অভিযোগ করেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ নিয়ে একাধিকবার তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু নিজেদের লোক দিয়ে কমিটি করতে গিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। ফলে তারা কমিটি দিতে পারছেন না।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অধীনে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি দেওয়া খুব জরুরি। আবার সামনে রমজান মাস। তাই এখন কমিটি করতে গেলে সমস্যা আরও জটিল হবে। তারপরও আমি যতটুকু জানি তারা চেষ্টা করছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক বড় সংগঠন। কোথাও কোথাও সম্মেলন হলেও কমিটি হয়নি। আবার কমিটি হলেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। তাই সম্মেলন ও কমিটি দ্রুত দিতে নির্দেশনা রয়েছে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে। ৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের কারণে সাংগঠনিক কাজ কিছুটা স্তিমিত ছিল। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে। আমি জানি ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের আওতাধীন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি গঠনের কাজ চলছে। হয়তো শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।







































