
পি. কে রায়, বিশেষ প্রতিনিধিঃ দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় ফেসবুকের ফেক আইডি ব্যবহার করে গোপন ছবি ও ভিডিও ফাঁস এবং অপপ্রচার চালানোর ঘটনায় "হক প্রকাশ" নামের আলোচিত আইডির সহযোগী সন্দেহে মোবাইল মেকানিক শাহিন আলম (৩০) কে আঁটক করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৩নং আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের পাকেরহাট বাজারে ‘শাহিন টেলিকম’ নামে একটি মোবাইল মেরামতের দোকান পরিচালনা করেন শাহিন আলম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করলেও গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ‘হক প্রকাশ’ আইডির সহযোগী সন্দেহে শাহিন আলমকে থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন তল্লাশি করে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ধার করা হয়। তার মোবাইলে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে গোপন চ্যাটিংয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি ১০ থেকে ১১টি ফেসবুক আইডি লগইন অবস্থায় পাওয়া যায়, যেগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হতো বলে ধারণা করছে পুলিশ।
ভুক্তভোগী মো.সুজন শেখ (২৮), যিনি পেশায় একজন সাংবাদিক, অভিযোগ করেন—গত ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তার স্ত্রীর ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোনের ডিসপ্লে নষ্ট হয়ে গেলে সেটি মেরামতের জন্য শাহিন আলমের দোকানে দেন। দুই দিনের মধ্যে ফোনটি মেরামত করে দেওয়ার কথা বললেও নির্ধারিত সময়ে সেটি ফেরত দেওয়া হয়নি।
এরই মধ্যে ৩ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ১০টার দিকে “হক প্রকাশ” নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে তার মেসেঞ্জারে হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। বার্তায় দাবি করা হয়, তার ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও তাদের কাছে রয়েছে এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই আইডি থেকে তাদের ব্যক্তিগত ছবি পোস্ট করা হলে বিষয়টি এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মোবাইলটি মেরামতের সময় তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে শাহিন আলম। পরে তিনি ‘হক প্রকাশ’ নামের ফেক আইডির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এসব তথ্য সরবরাহ করেন এবং অপপ্রচার চালাতে সহযোগিতা করেন। শুধু তাই নয়, জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শাহিন আলম নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য সরবরাহ করতেন, যা ব্যবহার করে মিথ্যা ও মানহানিকর পোস্ট তৈরি করা হতো।
এ ঘটনায় শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা জানান, “হক প্রকাশ” নামের ফেসবুক আইডি থেকে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত মানুষদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছিল। এতে সামাজিক বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছিল এবং মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হচ্ছিল।
এ বিষয়ে খানসামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল বাসেত সর্দার জানান, ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করি। জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত শাহিন আলমের মোবাইল থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিভিন্ন ফেসবুক আইডির সংযোগ পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে তার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়ায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এর আওতায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি এ ঘটনায় জড়িত অন্যান্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, আটককৃত শাহিন আলমের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্য সহযোগীদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করা গুরুতর অপরাধ। তারা দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী সুজন শেখ বলেন, আমার পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয়কে কেন্দ্র করে যেভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে, তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই এবং চাই ভবিষ্যতে যেন আর কেউ এ ধরনের ঘটনার শিকার না হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ‘হক প্রকাশ’ আইডির মূল নিয়ন্ত্রকসহ অন্যান্য জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।



























