
এবারও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন কীটতত্ত্ববিদরা। তাঁরা বলছেন, এখন যে মশার উপদ্রব দেখা যাচ্ছে, এটি কিউলেক্স। এখনই প্রজননস্থল ধ্বংসের মতো ব্যবস্থা না নিলে মে নাগাদ ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেবে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে কিউলেক্স মশা কমেছে, সামনের সপ্তাহে আরও কমবে। তবে বৃষ্টি হলে আবার এডিস মশা বেড়ে যায়। তাই যত্রতত্র পাত্র না রাখা এবং নালা-নর্দমার আবদ্ধ পানি চলমান করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
অতিষ্ঠ নগরবাসী
রাজধানীতে এখন মশার উপদ্রব চরমে পৌঁছেছে। সন্ধ্যা নামার আগেই বাসাবাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। নিচতলা বা অন্ধকার জায়গা তো বটেই, অনেক এলাকায় দিনদুপুরেও মশারি টানিয়ে বা কয়েল জ্বালাতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে ধানমন্ডি, গুলশানের মতো অভিজাত এলাকাতেও দাপট মশার। নগরবাসীর অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মীদের দেখা মেলে কালেভদ্রে। তাদের ফগার মেশিনের ধোঁয়ায় মশা তো মরেই না, বরং কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে।
মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা আমির হামজা বলেন, গত বছর ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ অবস্থা দেখেছি, এবার তো আগেভাগেই বেড়েছে মশা। পরিবার নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছি।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, শুধু ফগিং করে মশা নিধন বা কমানো সম্ভব নয়। এর জন্য মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা ও টায়ারে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, জরিপে আমরা দেখেছি– গত সপ্তাহের চেয়ে এখন ২০ শতাংশ মশা কমেছে। আস্তে আস্তে আরও কমবে। কিন্তু যদি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করা যায়, তাহলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। মশক নিধনের জন্য ফগিং কোনো কার্যকরী পদ্ধতি না। কিন্তু এর পেছনে প্রচুর টাকা নষ্ট হয়। আবার এটি জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।
ডেঙ্গু নিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক
কিউলেক্স মশার দাপটের মধ্যেই জনমনে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু। সাধারণত মে-জুন থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে তা চূড়ায় পৌঁছে। কিন্তু সরকারের তথ্য বলছে, এবার বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৫৬২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন; মারা যান ৪১২ জন। ২০২৪ সালে এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন, ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালটি ছিল ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ প্রাণহানির বছর।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য সরকারি সংস্থাগুলোকে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর কথাও বলছেন তারা।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশার ব্রিডিং সোর্স ম্যানেজমেন্ট, প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। লার্ভা ম্যানেজমেন্টসহ জনগণকে সচেতন করে সম্পৃক্ত করা গেলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। না হলে ডেঙ্গু এ বছরও ভোগাবে।
সরকারের বিশেষ কর্মসূচি
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৪ মার্চ থেকে দেশজুড়ে প্রতি শনিবার নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি বা ‘ক্লিনলিনেস ড্রাইভ’ ঘোষণা দিয়েছেন। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে বাড়ি, আঙিনা, ড্রেন ও জলাধার পরিষ্কার রাখতে বিভিন্ন জেলায় কর্মসূচি দেখা গেছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এই বিশেষ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে– এডিস মশার সম্ভাব্য জন্মস্থল হিসেবে চিহ্নিত পরিত্যক্ত ও অব্যবহৃত পাত্র অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার, র্যালি আয়োজন, লিফলেট বিতরণ, সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার এবং গণযোগাযোগ কার্যক্রম।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘মশক নিয়ন্ত্রণে আমরা মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছি। এই কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে চার স্তরে (ওয়ার্ড পর্যায়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সচিব পর্যায় এবং প্রশাসক পর্যায়) নিবিড় তদারকি করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় ইমামদের সম্পৃক্ত করা হবে এবং মাইকিং কার্যক্রম চলবে। তবে নাগরিকরা সচেতন না হলে এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে অঞ্চলভিত্তিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। সূত্র: বাংলাস্ট্রিম




































