
দেশের ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের আমানত অস্বাভাবিকভাবে কমেছে। বিশেষ করে ২৫ কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাব থেকে গত এক বছরে হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের জমার পরিমাণ কমেছে-যা ব্যাংক খাতের তারল্যচাপকে আরও স্পষ্ট করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমবারের মতো ব্যাংক খাতের এমন বিস্তৃত পরিসংখ্যান প্রকাশ করল।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে-এমন হিসাব থেকে মোট ৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আলোচ্য সময়ে এ ধরনের হিসাবধারীর সংখ্যা কমেছে ১১৯ জন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি ব্যক্তির হিসাব নয়। কারণ ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আবার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে এক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির একাধিক অ্যাকাউন্টও রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কোটি টাকার হিসাবও রয়েছে।
২০২৪ সালের জুনে ২৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে আমানত ছিল—এমন হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৫১টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৯৮-এ, জমা নেমে আসে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। গত বছরের জুনে হিসাবের সংখ্যা আরও কমে ৭৮-এ দাঁড়ায় এবং জমা কমে হয় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এ শ্রেণিতে হিসাব কমেছে ৭৩টি এবং আমানত কমেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে-এমন গ্রাহক ২০২৪ সালের জুনে ছিলেন ৭২ জন। তাদের হিসাবে জমা ছিল ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৬-এ এবং জমা নেমে আসে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। গত বছরের জুনে হিসাবসংখ্যা ২৬-এ অপরিবর্তিত থাকলেও জমা সামান্য বেড়ে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এক বছরে এ শ্রেণিতে গ্রাহক কমেছে ৪৬ জন এবং আমানত কমেছে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। দুই শ্রেণি মিলিয়ে মোট ১১৯ জন উচ্চমূল্যের আমানতকারী কমেছে এবং তাদের হিসাবে জমা কমেছে ৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বড় অঙ্কের এ আমানতের একটি অংশ ভেঙে ছোট ছোট অঙ্কে বিভিন্ন ব্যাংকে পুনরায় জমা রাখা হয়েছে। আবার কিছু অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি দেশত্যাগের আগে ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নিয়েছেন-এমন তথ্যও রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর সংখ্যা ও তাদের জমা-উভয়ই বেড়েছে। একইভাবে ২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হিসাবেও প্রবৃদ্ধি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এ প্রবণতা মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঞ্চয় সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। তবে ২৫ লাখ টাকা আমানতকারীর সংখ্যা ও জমা কিছুটা কমেছে, যা ছোট অঙ্কের হিসাবে আমানত বণ্টন এবং আমানতভিত্তির বৈচিত্র্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ, ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি এবং ১ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানতধারীর সংখ্যা ও জমা-উভয়ই বেড়েছে।
২০২৪ সালের জুনে পরিবারভিত্তিক ব্যক্তিগত আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ২৩ লাখ। তাদের হিসাবে জমা ছিল ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। গত জুনে তা বেড়ে ১৫ কোটি ৮৫ লাখে দাঁড়িয়েছে। তাদের আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি কোটিপতি পরিবারভিত্তিক আমানতকারীর সংখ্যা ২০২৪ সালের জুনে ছিল ৩৪ হাজার ৯৪৫ জন। তাদের হিসাবে আমানত ছিল ৯২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
গত জুনে আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে ৩৭ হাজার ৩৬ জনে পৌঁছেছে। তবে তাদের মোট জমার পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার কোটি টাকায়। এর পাশাপাশি ব্যাংক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি খাতের আমানতকারীরাও রয়েছেন, যাদের তথ্য এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চমূল্যের আমানতে সংকোচন এবং জমার পরিমাণ কমে যাওয়া ব্যাংক খাতের তারল্য ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। মোট আমানত ও হিসাবসংখ্যা বাড়লেও প্রবৃদ্ধির ধারা ধীর হওয়ায় উদ্বেগ কমেনি।





































