
এখন বোরো মৌসুম চলছে। প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের দাবদাহ। পুড়ছে মানুষের দেহ, পুড়ছে ফসলের ক্ষেত। দেশের খাদ্য উৎপাদনের ৬০ শতাংশই আসে বোরো থেকে। কৃষকের ক্ষেতে দোল খাচ্ছে সবুজ ধান। কোথাও ধানের ফুল, কোথাও হলুদাভ ধান। কোনো কোনো অঞ্চলে ধান কাটা-মাড়াই শুরুও হয়ে গেছে। তবে শেষ বেলায় কৃষকের সেই স্বপ্নের ফসলে আগুনের হলকা হয়ে এসেছে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি। এমনিতেই বিদ্যুতের অভাবে সময়মতো সেচ দেওয়া যায়নি। এর মধ্যে গত শনিবার ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, ১৮ টাকা বাড়িয়ে কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। নতুন করে এই দাম বৃদ্ধিতে কৃষকের এখন ত্রাহি অবস্থা। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিতে উৎপাদন খরচ প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা বিঘাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত গড়াতে পারে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, কৃষি খাতে মোট ডিজেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত ছয় মাসের সেচ মৌসুমে কৃষিতে ডিজেলের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন। শুধু সেচযন্ত্রেই প্রয়োজন প্রায় সাত লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি। সেচ, জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, পরিবহনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজেলের প্রয়োজন হয়। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম এখনও ডিজেলনির্ভর। দেশে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন আছে প্রায় ১৬ লাখ। দাম বাড়ায় বিঘাপ্রতি সেচ খরচ বাড়বে ৩০০-৬০০ টাকা। ফলে শ্যালোতে বাড়তি খরচ হবে ১৩০০ কোটি টাকা।
ডিএইর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯টি ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গভীর ও অগভীর নলকূপ, এলএলপি পাম্প, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, মাড়াই-ঝাড়াই যন্ত্রসহ অন্যান্য কৃষিযন্ত্র। কম্বাইন্ড হারভেস্টার আছে ১০ হাজার ৭২৬টি। মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্যান্য যন্ত্র রয়েছে চার লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি।
ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে খুলনা অঞ্চলে কৃষি, মৎস্য, নৌ-পরিবহন ও কাঁচাবাজারে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হয়েছে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এই অঞ্চলে জ্বালানি সংকট সরাসরি জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। ফলে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়েছে।
খুলনার ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা ও তেরখাদা উপজেলায় বোরো ধান ও চিংড়ি ঘেরে সেচের জন্য প্রধানত ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকরা। ডিজেলের দাম বাড়ায় প্রতি বিঘা জমিতে সেচ খরচ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেড়েছে।
বটিয়াঘাটার কৃষক সালাম জানান, তিনি ৩০ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। এতে চাষ, সেচসহ প্রতি বিঘায় প্রায় ১৫ লিটার ডিজেল লাগে। ডুমুরিয়ার আব্দুল হালিম বলেন, এক বিঘা জমিতে সেচে এক হাজার টাকা বেশি লাগছে। লোডশেডিং বেড়েছে। সেচের অভাবে ধানের শীষ শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। খুলনার দৌলতপুরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন খান বলেন, ট্রাক ভাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও ডিজেল সংকটে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে রংপুরের কৃষি। ইতোমধ্যে তেল সংকটে সঠিক সময়ে সেচ দিতে না পেরে ফলন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষক। তেলের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এ অবস্থায় কৃষি খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধিসহ তেলের দাম কমানোর দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
রংপুর নগরীর ১২নং ওয়ার্ড নজিরেরহাট কৃষক বেলাল হোসাইন চলতি বছর ১৯ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। তিনি সময়মতো ক্ষেতে সেচ দিতে পারেননি। তেলের জন্য পাম্পে গেলে ২০০ টাকার বেশি তেল পান না। ভুট্টার জমিতে পানি দিতে না পেরে ফলন খারাপ হয়েছে। কম্বাইন্ড হারভেস্টারে তেলের অভাবে কোথাও ধান কাটতে যেতে পারেননি।
ভরা মৌসুমে যখন কৃষকের ঘরে ধান ওঠার আনন্দ থাকার কথা, ঠিক তখনই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের কৃষকরা। ডিজেলের সংকটের পাশাপাশি বাড়তি দামের চাপেও মাঠে কম্বাইন্ড হারভেস্টার (ধান কাটার যন্ত্র) অচল হয়ে পড়েছে। এতে ধান কাটা ব্যাহত হওয়ায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে কৃষক পরিবাগুলো।
তাদের অভিযোগ, স্থানীয় পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
কৃষক আতাউর রহমান বলেন, মাঠে ধান পেকে গেছে, কিন্তু তেলের অভাবে মেশিন নামাতে পারছি না। গত বছর প্রতি বিঘা ধান হারভেস্টারে কাটতে খরচ হতো প্রায় ১৫০০ থেকে ১৭০০ টাকা, এবার তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায়।
হারভেস্টার চালক করিম মিয়া জানান, একটি মেশিন সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ১৬০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে তারা পাচ্ছেন মাত্র ৪০ লিটার। অনেক মেশিনই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তেলের দাম বাড়ায় মেশিনের ভাড়াও কিছুটা বেড়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাবে সিলেটের কৃষি খাত বাড়তি চাপে পড়েছে। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে এমন পরিস্থিতি তাদেরকে উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে, আগে প্রতি বিঘা বোরো ধান উৎপাদনে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ হলেও বর্তমানে তা ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। সেচ খরচ বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে সিলেট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে এখনো জেলায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি।
তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং ডিজেলের সংকটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে কৃষকরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। ধান কাটা শুরু না হলেও সেচ ও আবাদ পর্যায়েই বাড়তি খরচে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। কৃষকরা জানান, বিদ্যুতের অভাবে তারা ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করছেন। এতে প্রতি বিঘা জমিতে সেচ খরচ আগের তুলনায় প্রায় ১ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার সাকলাইন হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
চট্টগ্রামের ‘শস্যভান্ডার’ খ্যাত গুমাই বিলে ১০ একর জমিতে চাষ করেছেন জমির উদ্দিন। এবারের বোরো ফলন নিয়ে অনেকটা চিন্তিত তিনি। এবার সঠিক সময়ে প্রয়োজনমতো সেচ দিতে পারেননি। তিনি বলেন, ১০ একর জমির আড়াই একর নিজের ডিজেলচালিত, সাড়ে তিন একর বিদ্যুৎচালিত পাম্প এবং চার একর জমিতে ভাড়া করা পাম্প দিয়ে সেচ দিতে হয়। তিনি বলেন, খালে প্রয়োজনীয় পানি থাকলেও প্রয়োজনীয় তেল না পাওয়ায় সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে তিন ঘণ্টা থাকে না। এবারে ফলন খুব একটা ভালো হবে না।
নওগাঁর পোরশায় নিতপুর ইউনিয়নের কৃষকদের মাঝে ডিজেল সরবরাহ তদারকি করছেন ইউএনও রাকিবুল ইসলাম। ‘কৃষি বাঁচুক, কৃষক বাঁচুক’-এর আলোকে তিনি নিজ উদ্যোগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কৃষকদের বোরো ধানে সেচের জন্য এ ব্যবস্থা করেছেন। রাকিবুল ইসলাম জানান, বর্তমান বোরো ধানের মৌসুম। এ সময় ধান পাকার উপক্রম হওয়ায় কৃষি সেচকাজে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে কৃষকদের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। উত্তর কামলাবাজ গ্রামের কৃষক মো. দুলাল মিয়া জানান, আগে যেখানে প্রতি একর জমিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেচ দিতে ডিজেল খরচ হতো ১ হাজার টাকা, এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সেই খরচ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায়।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। এবার ডিজেলের দাম খুব বেশি বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ডিজেলে বেড়েছে ৩৩ শতাংশ, কেরোসিনে বেড়েছে ১৬ শতাংশ। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে খাদ্যমূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। আর গত ৪ বছর ধরে দেশে খাদ্যমূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে লাল তালিকাভুক্ত খাদ্যমূল্যস্ফীতি।
তিনি বলেন, বোরো মৌসুমে দাম বৃদ্ধি উৎপাদনকে ব্যাহত করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) বলছে, বোরো মৌসুমে সাড়ে ৭ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। আর এ অবস্থা হলে আমদানির চাপ বাড়বে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে। ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শুধু বোরো মৌসুম নয় বরং আউশ, আমন, ও রবিশস্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

































