
মোবাইল ফোন, হাতব্যাগ বা পথচারীদের দামি বস্তু নিয়ে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে, ভোঁ দৌড় দেয় ওরা। সময় নেয় কয়েক সেকেন্ড। ওরা আসে মোটরসাইকেল চড়ে আবার কখনও সিএনজি অটোরিকশা কিংবা প্রাইভেটকার নিয়ে। ফাঁকা কিংবা জনাকীর্ণ সড়কে চোখের পলকে ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। এভাবে প্রতিনিয়ত রাজধানীর খিলগাঁও, বনশ্রী, মাদারটেক, মেরাদিয়া, আমুলিয়া, স্টাফ রোডসহ বহু এলাকায় অনেকটা টার্গেট করেই ছিনতাই করে চক্রগুলো। পুরো এলাকায় তাদের রাজত্ব। দাপট দেখে মনে হবে এদের টুঁটি ধরার সাহস নেই কারও। হাতে কখনও ছুরি, কখনও পিস্তল; ডান্ডি ও ইয়াবার নেশায় বুঁদ এসব ছিনতাইকারী।
গত শনিবার ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা ছুঁইছুঁই। রাজধানীর মাদারটেকের মূল সড়ক দিয়ে রিকশাযোগে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন অজ্ঞাত এক নারী। হঠাৎ অটোরিকশায় আসা দুর্বৃত্তরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোঁ মেরে রিকশারোহীর হাতব্যাগ নিয়ে দ্রুতগতিতে পালিয়ে যায়। ওই নারীর চিৎকারে প্রত্যক্ষদর্শী একজন দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করলেও ওই অটোরিকশাটি আটকাতে পারেনি। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি এই নম্বরের অটোরিকশাসহ আরও কয়েকটি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়ে প্রতিদিন ছিনতাই হয় খিলগাঁও, সবুজবাগ, রামপুরা, মুগদা, যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা এলাকায়।
গত ৫ এপ্রিল রাতে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের রায়েরবাগ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক পথচারী। হঠাৎ তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে তিন-চারজন যুবক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন তার পেটের কাছে ধারালো ছুরি ঠেকায়। দুজন পকেটে হাত দিয়ে নিয়ে নেয় দুটি স্মার্টফোন ও নগদ টাকা। তারপর মুহূর্তেই আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যায় তারা। এ ঘটনার আরও আগে গত ৩১ মার্চ ভোর সাড়ে ৫টার দিকে যাত্রাবাড়ী মোড়ে পেছন থেকে তিনজন এসে গলায় ছুরি ধরে রমজান নামে এক যুবকের মোবাইল ও মানিব্যাগ নিয়ে যায়। এভাবেই যাত্রাবাড়ী-মাতুয়াইল, রায়েরবাগ এলাকায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ছিনতাইকারীরা। রাত হলেই অস্ত্র ঠেকিয়ে প্রকাশ্যে সড়কে চলে ছিনতাই। এসব স্থানে সড়কবাতি অকেজো থাকায় অন্ধকারে যানজট লাগলে পথচারীদের আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। যানজটে থেমে থাকা গাড়িতে দেশীয় অস্ত্রের মুখে চলে ছিনতাই। সম্প্রতি একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, যানজটে আটকে থাকা একটি প্রাইভেটকারের দরজা খুলে অস্ত্র ঠেকিয়ে সব লুট করে নিয়ে যাচ্ছে কয়েক ছিনতাইকারী। যাদের সবার হাতে দেশীয় অস্ত্র।
এসব দুর্বৃত্ত শুধু পথচারী বা যাত্রীদের মালামাল কেড়ে নিয়েই খান্ত থাকে না; ছিনতাইয়ের সময় বাধা পেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভুক্তভোগীকে গুরুতর জখমও করে। এতে প্রাণ হারান অনেকে। এমনকি তারা চেতনানাশকও ব্যবহার করে থাকে। গভীর রাতে একা চলাফেরা যারা করছেন তাদের অনেকেই ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। আবার জরুরি প্রয়োজন বা ভোরে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য বের হন, তাদের কেউ কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন।
গত ৮ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে বনশ্রী এলাকা থেকে শাহা আলমের অটোরিকশায় দুজন যাত্রী ওঠে। পথে তাকে অজ্ঞান করে রিকশাটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। স্থানীয়রা অজ্ঞান অবস্থায় শাহা আলমকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেলে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ এপ্রিল মারা যান তিনি। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশ জড়িতদের শনাক্তে বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকার শতাধিক সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গত ৪ মে অটোরিকশা ছিনতাই চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, গত ৯ মাসে এই চক্রটি শতাধিক রিকশা ছিনতাই করেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগÑ শহরের যেসব স্থানে সিসি ক্যামেরা নেই, ছিনতাইয়ের জন্য সেই সব জায়গা বেছে নেয় দুর্বৃত্তরা। প্রতিদিন রাজধানীতে একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও থানায় মামলার সংখ্যা কম। অনেক ভুক্তভোগীই হয়রানি বা ঝামেলা এড়াতে থানায় অভিযোগ করেন না। কারও মোবাইল ছিনতাই হলে পুলিশ ছিনতাই মামলা না নিয়ে হারিয়ে যাওয়া বা জিডি করার পরামর্শ দেয়।
যাত্রাবাড়ী এলাকার ভুক্তভোগী রমজান জানান, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে গাড়িতে ওঠার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় তিনজন এসে গলায় ছুরি ধরে মোবাইল, মানিব্যাগ ও হাতঘড়ি ছিনতাই করে। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ জিডি নেয়।
রায়েরবাগে ছিনতাইয়ের শিকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী জানান, রাস্তা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকায় হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ কয়েকজন কিশোর পেটে ছুরি ঠেকিয়ে বলে, যা আছে দিয়ে দে। তাদের মধ্যে ভালো গেঞ্জি পরা লম্বা এক যুবকের কাছে পিস্তল ছিল। এ ঘটনার পর চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। ওরা আমার মোবাইল, মানিব্যাগ নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। তারা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে ধারণা ওই ব্যক্তির।
যাত্রাবাড়ী-চিটাগাং রোডে লেগুনাচালক রাহাত হোসেন বলেন, দনিয়া কলেজ থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায়ই ছিনতাই হয়। মাঝেমধ্যে দেখি পুলিশ একস্থানে বসে থাকে। ঘটনা ঘটার পর আসে। কিন্তু ততক্ষণে পালিয়ে যায় ছিনতাকারীরা।
রাজধানীতে ছিনতাই ঠেকাতে ট্রাস্কফোর্স গঠন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সম্প্রতি ছিনতাইকারী ও ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে রাজধানীতে ২৮টি হট স্পটসহ শতাধিক স্পট চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এতে ছিনতাইয়ের ঘটনা কমেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। পুলিশের দাবি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় বেশিরভাগই ছিঁচকে চোররা জড়িত। তারা রাস্তায় চলাচলকারীদের মোবাইল অথবা স্বর্ণের চেইন টান দিয়ে নিয়ে যায়। এসব ছিনতাইকারীর বেশিরভাগই মাদকসেবী।
ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, যাত্রাবাড়ী হয়ে দেশের ৪০টি জেলায় যাত্রীরা যাতায়াত করে। রাতেও সমানতালে ব্যস্ত থাকে সড়ক। যানজট লাগলে গাড়ির গতি কমে যায়। এ সুযোগ নেয় অপরাধীরা। তারা ছিনতাইয়ের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে সহজ মনে করে। ফলে ওই এলাকায় প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশের বিশেষ তৎপরতার কারণে এ মাসে ছিনতাইয়ের সংখ্যা কম। ১৫-২০ দিন ধরে বিভিন্ন সুপারভিশন ও মাঠে পুলিশি তৎপরতার কারণে ছিনতাই অনেকটা কমেছে।
দুর্বৃত্তদের ধরতে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে ডিসি ইকবাল হোসাইন বলেন, রাতে যাতে সড়কে পর্যাপ্ত আলো থাকে, সেজন্য সড়কবাতি বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। রায়েরবাগ-শনিরআখড়া থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পর্যন্ত ৬টি স্পেশাল টিম নিয়োজিত আছে। ছিনতাই ঠেকাতে টহল টিমও কাজ করছে।
এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রায় ৫০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে ছিনতাই থাকবে না বলে আশা করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হায়াতুল ইসলাম বলেন, আমরা অপরাধীদের নজরদারিতে রাখি। ছিনতাই প্রতিরোধে ডিএমপি একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। যখন যেটা আমাদের কাছে অ্যালার্মিং মনে হচ্ছে, আমরা সেই জায়গাগুলোতে কাজ করছি।







































