
হোটেল ও রেস্তোরাঁ বিধিমালা-২০১৬ অনুযায়ী এ ধরনের প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের পূর্বশর্ত হিসেবে বলা হয়েছে- যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও শর্তপূরণ সংক্রান্ত দলিলাদি থাকতে হবে। এ ছাড়া ভবনের পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত প্ল্যান জমা দিয়ে নিবন্ধন নিতে হয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে। আরও প্রয়োজন সিটি করপোরেশনের দেওয়া ব্যাবসায়িক সনদ বা ট্রেড লাইসেন্স। আর ট্রেড লাইসেন্স পেতে হলে ফায়ার সেফটি সনদ ছাড়াও জেলা প্রশাসকের অনুমোদন, বিস্ফোরক দপ্তরের অনুমোদন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকতে হয়। সেই সঙ্গে অবশ্য-প্রয়োজনীয় ভবন ব্যবহারের অকুপেন্সি সনদ থাকাও। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁরই অন্যান্য সনদ ও অনুমোদন থাকলেও নেই অকুপেন্সি সনদ। অর্থাৎ যে সনদ নিশ্চিত করবে ভবনটির নিরাপদ ও যথাযথ ব্যবহার, সেই সনদই নেই। এ সনদ ছাড়াই রাজধানীর যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে হোটেল- রেস্তেুারাঁ। সঙ্গত কারণেই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
রাজধানীর সাত মসজিদ রোড, গুলশান অ্যাভিনিউ, বেইলি রোড, খিলগাঁও, মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে আবাসিক কাম বাণিজ্যিক এবং বাণিজ্যিক ভবনে যেখানে-সেখানে যাচ্ছেতাইভাবে চলছে রেস্তোরাঁ ব্যবসা। নেই নিরাপত্তার বালাই। ফলে যে কোনো সময় যে কোথাও বেইলি রোড ট্র্যাজেডির মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
অকুপেন্সি সনদ নিতে হয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে। এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞাবলেন, অকুপেন্সি সনদ ছাড়া কোনো ভবন ব্যবহার করা যাবে না। আমরা সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে অবগত করেছি যে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার আগে অবশ্যই অকুপেন্সি সনদ আছে কিনা, তা যাচাই করে দিতে হবে।
বেইলি রোড ট্র্যাজেডি প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এ দুর্ঘটনার পর আমরা আরও তৎপর হয়েছি; কোনো ছাড় দিচ্ছি না। আমাদের টিম রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শনে যাচ্ছে। যেখানেই মনে হবে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি, বিধির ব্যত্যয় ঘটেছে, সেখানেই তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেওয়া হবে; সেবা সংস্থাগুলোকে বলা হবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে।
এদিকে বহুতল ভবনে ভাড়া নিয়ে হোটেল-রেস্তেুারাঁ ব্যবসা করছেন যারা, তারা ভবনের অনুমোদন না থাকা কিংবা বিধিবহির্ভূত কাজের জন্য দায় নিতে নারাজ। তাদের যুক্তি- ভবনের যাবতীয় সনদ ও অনুমোদন নিশ্চিত করার দায়িত্ব ভবন মালিক বা ডেভেলপার্সের।
বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভবনের ডিজাইন, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯, অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩, ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০১৬-৩৫, গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা ১৯৯১সহ নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ আইন, ইমারতসংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা প্রভৃতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন রয়েছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় রাষ্ট্রের নগর ও প্রশাসনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা যেমন- রাজউক, সিটি করপোরেশন এবং করপোরেশনের কাউন্সিল অফিস ও জোনাল অফিস, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও পরিসেবাসংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থার গাফিলতিজনিত দায় রয়েছে। ভবন মালিক ও ভবনে রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যর্থতার কারণে সাধারণ মানুষকে কেন প্রাণ হারাতে হবে? প্রশ্ন রাখেন তিনি। বলেন, এক্ষেত্রে ভবন মালিক এবং ভবনে রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর গাফিলতি চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করা হলে এমন ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে। ইতিপূর্বে সংঘটিত এ ধরনের অগ্নিকা-ে দায়মুক্তির সংস্কৃতিই এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তির কারণ।
এই পরিকল্পনাবিদ আরও বলেন, আমাদের নগর সংস্থাসমূহের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। রাজউক যে ভবনে কেবল অফিস করার অনুমতি দিয়েছে, সেই ভবনে সিটি করপোরেশন কীভাবে রাজউকের অনুমোদনপত্রকে আমলে না নিয়ে রেস্টুরেন্ট করার জন্য ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। আবার ফায়ার সার্ভিসের ফায়ারসংশ্লিষ্ট অনুমোদন না নিয়েই কীভাবে এই রেস্টুরেন্ট ব্যবসা চলছে, সেটাও বিস্ময়কর। নগর সংস্থাসমূহের কার্যকর সমন্বয়ের অভাবেই এই ভবনগুলোকে নিরাপদ করা যাচ্ছে না।
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে রাজধানীর নিউ বেইলি রোডের গ্রিন কোজি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর বিভিন্ন মহলের আলোচনায় উঠে আসে রাজউকের কার্যক্রম প্রসঙ্গ। অনেকে তুলে ধরেন সাত মসজিদ রোডের ৭৩৬, কেবি স্কয়ারের কথা। সেখানকার ১৫ তলা ভবনে ২০টি রেস্তোরাঁ রয়েছে। গাউসিয়া টুইন পিক নামে পরিচিত এই ভবনটির নকশা করেছে স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশের প্রতিষ্ঠান ভিসতারা আর্কিটেক্টস। বেইলি রোড ট্র্যাজেডির পর নিজের নকশা করা এই ভবনটিতে সাধারণ মানুষকে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ। এরপর থেকে শুরু হয় নানা আলোচনা। এতে করে ঘুম ভাঙে রাজউকেরও। গতকাল রবিবার রাজউকের জোন ৫/১-এর অথরাইজড অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একটি টিম টুইন পিক ভবনটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শনকালে ঘটনাস্থলে তিনি বলেন, ভবনটিতে ২০টির মতো রেস্তোঁরা রয়েছে। বাণিজ্যিক ভবনের অনুমতি থাকলেও রেস্তোরাঁ করার জন্য কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তারা অকুপেন্সি সনদ ছাড়াই ব্যবসা করছেন। তা ছাড়া ভবনটির ১৪ তলার অনুমোদন রয়েছে, কিন্তু বানানো হয়েছে ১৫ তলা। সিভিল এভিয়েশনের উচ্চতার মাত্রায় থাকার কথা ১৫০ ফুট; রয়েছে ১৯০ ফুট। তারা দুটি শর্ত ভঙ্গ করেছে। এ জন্য পরিদর্শন করে নোটিশ দিয়ে গেলাম। পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে, এসব রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল রবিবার ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোড এলাকায় গড়ে ওঠা রেস্তোঁরার প্রায় ৫-৬টি ভবনঘরে দেখা যায় এই এলাকার অধিকাংশ ভবনই নতুন। যেগুলো পুরাতন, সেগুলোতেও রয়েছে রেস্তোরাঁ ব্যবসা। গাউসিয়া টুইন পিক ভবনটি ঘুরে দেখা যায়, সেখানে পেছনের দিকে দুটি জরুরি নির্গমন সিঁড়ি ও চারটি লিফট রয়েছে। তবে পুরো ভবনটি কাচে ঘেরা। তা ছাড়া রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুবিধামতো ইন্টেরিয়ার করেছে। ব্যবহার হয়েছে পার্টিকেল বোর্ডসহ অনেক অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জামাদি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), গ্যাসের চুলা, ধোঁয়া বের করার পাইপ সব নিজেদের সুবিধামতো বসিয়েছে। সাত মসজিদ রোড এলাকায় ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা ১৫০ ফুট থাকলেও, গাউসিয়া টুইন পিক ভবনের উচ্চতা ১৯০ ফুট। তাই আপত্তি রয়েছে সিভিল এভিয়েশন অথরিটিরও।
ভবনটির রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এহসান আনোয়ার বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সেফটি সনদ, ডিসি অফিসের অনুমোদনসহ সমস্ত দলিল আমাদের রয়েছে। ভবনের অকুপেন্সি সনদের বিষয়টি দেখার কথা ডেভেলপার্সদের। এটা তারা বলতে পারবেন। রাজউক পরিদর্শন করে আমাদের এসিসহ কিছু বিষয়ে সংশোধন করতে বলেছে। আমরা আজ (রবিবার) থেকেই শুরু করেছি। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাদের নির্দেশিত শর্তগুলো পূরণ করা হবে। এই ভবনটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। এখানে যে কেউ এসে খেতে পারবেন।
স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশের ফেসবুক স্ট্যাটাস সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি তার ও ডেভেলপার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিপর্যায়ে দ্বন্দ্বের বহির্প্রকাশ। এখানে আমাদের বলার কিছু নেই। তবে আশা করি তিনি তার স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে নতুন করে দেবেন।
এ ছাড়া সাত মসজিদ রোডের ১০/এ, ৫৪নং ভবনটি ১২ তলার। ১২ তলা ভবনেও ১৭টি রেস্তোরাঁ। একই রোডের জিএইচ হাইটসের ১৪ তলা ভবনে ১০টি রেস্তোরাঁ। এই রোডের ধানমন্ডি ৩/এ রোডের ৫৪নং ভবনটিতে তিনটি রেস্তোরাঁ, ৪/এ রোডের ৫৫নং ভবনে তিনটি রেস্তোরাঁ দেখা গেছে। এই ভবনগুলো ছাড়াও অন্যান্য ভবনে রেস্তোরাঁ রয়েছে। শুধু সাত মসজিদ রোড নয়; শ্যামলী, মিরপুর, গুলশান অ্যাভিনিউ, বনানী, বেইলি রোড, খিলগাঁওসহ রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ। এসব ভবনের অধিকাংশেরই অকুপেন্সি সনদ নেই বলে জানা গেছে।
রাজউকের অকুপেন্সি সনদ পেতে হলে সব তলার উচ্চতা, নির্মিত স্থাপত্য অংকন, সব তলার ফ্লোর প্ল্যান, নির্মাণ নকশা, নির্মাণ নকশার লে-আউট প্ল্যান ইত্যাদি জমা দিতে হয়। ব্যবহার উপযোগী সনদের মেয়াদ অনুমোদনের তারিখ থেকে ৫ বছর। অকুপেন্সি সনদ পেতে লাগে ১৪৪২ টাকা।







































