
শেখ রিফাদ মাহমুদ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন আদর্শের পথে, সংগ্রামের দাবদাহে। রুহুল কবির রিজভী সেই উজ্জ্বল নামগুলোর একটি। ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম পুরোধা হিসেবে রুহুল কবির রিজভী আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে লুকিয়ে আছে আত্মত্যাগ, সাহসিকতা ও অবিচলতার অগণিত গল্প। যাঁর জীবনের প্রতিটি পরতে মিশে আছে সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং জাতীয়তাবাদের অবিনাশী দীপ্তি।
ছাত্র রাজনীতির উত্তাল দিনগুলো থেকেই রিজভীর হাতে গড়ে উঠেছিল নেতৃত্বের বীজ। রাজশাহী সরকারি কলেজের বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন থেকে তাঁর পথচলা শুরু হলেও ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগদান করেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান ও পরবর্তিতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে বিপুল ভোটে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।
তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের সময় রাজশাহী রেলস্টেশনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি পিছু হটেননি, বরং আরও অদম্য হয়েছেন; সাহস ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন । সেই সময় থেকেই তাঁর শারীরিক যন্ত্রণা শুরু হয়, যা আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
কালের পরিক্রমায় ছাত্র রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির ময়দানে অবিচল যোদ্ধা হয়ে ওঠেন রিজভী। রাজনৈতিক জীবনে রিজভী আহমেদ বারবার নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। দীর্ঘ সময় কারাবরণ, বারবার রিমান্ডে যাওয়া, এমনকি শারীরিক নির্যাতনও তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজপথের লড়াই ছাড়া জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি থেকে শুরু করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বের পরিধি বিস্তৃত হয় দৃঢ় আদর্শিক মেরুতে।
বিশেষ করে বিএনপির সংকটময় সময়ে, যখন চারপাশে নিস্তব্ধতা আর ভয়ভীতি ঘিরে রেখেছিল দলটিকে, তখন রুহুল কবির রিজভী একা হাতে দলের মুখপাত্র হিসেবে রাস্তায় নেমেছিলেন। খালেদা জিয়ার কারাবরণের সময়, বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তিনতলার ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি বাই ৩ ফুট ৫ ইঞ্চি ছোট্ট একটি কক্ষে ৭৮৭ দিন একটানা অবস্থান করে তিনি দলের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের অমলিন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। একটি ছোট কক্ষ, একটি খাট, আর সীমাহীন অনমনীয়তা এটাই ছিল তাঁর সম্বল। ঈদ এসেছে, ঈদ গেছে; পরিবার পরিজন দূরে থেকেছেন, কিন্তু দলের পাশে থেকেছেন তিনি অবিচল অভিভাবকের মতো। প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন, মিছিল-মিটিং, নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ান এসবের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, সংকটের মধ্যেই প্রকৃত নেতৃত্বের জন্ম হয়।
সেই সময় তাঁর ওপর নেমে এসেছিল অভ্যন্তরীণ চাপও। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে তাঁকে কার্যালয় ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা, তালা ভেঙে হেনস্তা সবকিছু অদম্য সাহসিকতায় মোকাবিলা করে তিনি দেখিয়েছেন একজন সত্যিকারের সংগ্রামী রাজনীতিকের পরিচয়। তিনি বলেছিলেন, “আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যালয় ছেড়ে যাবো না।” এবং সেই অঙ্গীকার তিনি অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন।
জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে রুহুল কবির রিজভীর অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট ও অনমনীয়। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি আপসহীন কণ্ঠস্বর। ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলনে নিজ হাতে ভারতীয় চাদর ও স্ত্রীর ভারতীয় শাড়ি ছুড়ে ফেলে তিনি যেভাবে প্রতিবাদ করেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর সেই প্রেরণাদায়ী ভাষণ “এখানে হিন্দু-মুসলমান এই মাতৃকায় যাদের জন্ম এই মাটির সন্তান তারা। এখানে আমাদের সবার জন্ম। তারা এই দেশকে অন্যের গোলামির কাছে বিক্রি করবে কেন? এখানে যদি সিরাজ উদ দৌলা মোহনলাল একসঙ্গে লড়াই করতে পারে দেশের মুক্তির জন্য দেশ রক্ষার জন্য, ঠিক একইভাবে আমরা হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে লড়াই করব। দিল্লির দাসত্বকে খান খান করে দিব।”
রাজনৈতিক বন্দি জীবনের নির্মম অভিজ্ঞতা তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর রচিত বই ‘সময়ের স্বরলিপি’তে। তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখা ‘লৌহ কপাটের ভেতরে: আমি যখন বন্দি’, ‘কারাগারে দেখা এক মুকুলের কথা’তে একজন নির্যাতিত রাজনীতিকের হৃদয়ের গভীর বেদনা ও অঙ্গীকার ফুটে উঠেছে। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রাম, বন্দি জীবনের করুণ অধ্যায় এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শীভাবে তুলে ধরেছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ষড়যন্ত্র, নির্যাতন, হুমকি কিছুই তাঁকে বিচলিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান-পতনের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকেই রুহুল কবির রিজভীর মতো নেতাদের নাম অনিবার্যভাবে জড়িয়ে আছে। বারবার ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হতে হয়েছে বিএনপিকে। নানারকম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিএনপিকে নিঃশেষ করার ছক কষলেও খালেদা জিয়া, তারেক রহমানের নেতৃত্বে রুহুল কবির রিজভী’র মতো ইস্পাত-দৃঢ় নেতা-কর্মীদের জন্যই অত্যন্ত দৃঢ় ছিলো বিএনপি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে, লক্ষ লক্ষ মামলা মাথায় নিয়েও স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিলো, মনোবল থেকেছে অটুট। সারাদেশে রুহুল কবির রিজভী-দের মতো নেতাকর্মীরা জেল, জুলুম, হুলিয়াকে পরোয়া না করে নিজ গর্জনে এগিয়ে নিয়েছে বিএনপিকে।
ষড়যন্ত্র, নিপীড়ন, মামলা-মোকদ্দমা সবকিছু পেরিয়ে বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে রুহুল কবির রিজভী জাতীয়তাবাদের এক দুর্ভেদ্য স্তম্ভ। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস রচনায় যখন জাতি ফিরে তাকাবে, তখন রুহুল কবির রিজভী’র নাম উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায়। কারণ তিনি বারবার প্রমাণ করে দিয়েছেন, আদর্শের জন্য ত্যাগই হচ্ছে সত্যিকারের রাজনীতির প্রাণশক্তি। তাঁর অমিত সাহস, অবিচল আদর্শ এবং ত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনির্বাণ অনুপ্রেরণা।
লেখক: উপদেষ্টা পর্ষদ সদস্য, গ্লোবাল স্টুডেন্ট ফোরাম, এডুকেশন রিলেশন অফিসার, কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন







































