
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিংসতার ঘটনা বাড়তে পারে এমন আতঙ্কে ভুগছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করবে এটা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকা উঠিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এতে করে ক্ষমতাসীন দলটি কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন বা সমর্থন দেবে না। ফলে দল ও সহযোগী সংগঠনের যে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দলের তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক নেতা প্রার্থী হয়েছেন। টানা চতুর্থ দফায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় নবীন-প্রবীণ কেউ কাউকে মানতে পারছেন না। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত লেগেই রয়েছে।
উপজেলা নির্বাচনে দলীয় এমপি-মন্ত্রীর সন্তান ও স্বজনদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। শুধু তাই নয়, এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনরা যদি উপজেলা নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ান, তা হলে এমপি-মন্ত্রীদেরও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি এমপি-মন্ত্রীদের সন্তান ও স্বজন যারা নির্বাচনে প্রার্থী হবেন, তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে তাদের দলীয় কোনো পদ-পদবী থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাচনের সময় সহিংসতা এড়াতে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের সম্মেলন ও কমিটি গঠন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। কারণ এ সময় সম্মেলন বা কমিটি ঘোষণা হলে তৃণমূল পর্যায়ে সহিংসতা বেড়ে যেতে পারে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, দলের তৃণমূল পর্যায়ে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী। তাই এমপি-মন্ত্রী ও তাদের স্বজনদের নিবৃত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত ভোট বর্জন করেছে। তবে তাদের কেউ কেউ বিদ্রোহী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন। এ অবস্থায় এমপি-মন্ত্রীর স্বজনরা নির্বাচনে না থাকলে তারা প্রভাব খাটাতে পারবেন না। আর তারা প্রভাব খাটালে সংঘাতেরও আশঙ্কা রয়েছে। যা দেশে-বিদেশে সমালোচনার জন্ম দেবে। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই এ ধরনের বদনাম নিতে চান না দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন চান।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীদের সন্তান ও স্বজনদের ভোটের মাঠে নামিয়েছেন। তাদের অনেকে বলেছেন, দল আসলে কতটা কঠোর হবে, সেটা তারা বোঝার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে স্থানীয় এমপি একরামুল করিম চৌধুরী তার ছেলেকে ভোট না দিলে উন্নয়নকাজ না করার হুমকি দিয়েছেন। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় এমপি মোহাম্মদ আলী তার স্ত্রী ও ছেলে আশিক আলীকে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী করেছেন। নীলফামারীর ডিমলায় এমপি আফতাব উদ্দিন সরকারের চাচাতো ভাই আনোয়ারুল সরকার ও ভাতিজা ফেরদৌস পারভেজ উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন। মাদারীপুর-২ আসনের এমপি ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খানের বড় ছেলে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সদস্য আসিবুর রহমান খান এবং এমপির চাচাত ভাই পাভেলুর রহমান (শফিক) খান নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
এ ছাড়া ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের শ্যালক নাটোরে লুৎফুল হাবিবের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে এমন আরও অনেক অভিযোগ নজরে এসেছে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ডেকে উপজেলা নির্বাচনে এমপি-মন্ত্রীদের সন্তান ও স্বজনদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এমপি-মন্ত্রীদের সন্তান ও স্বজনদের উপজেলা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। যারা প্রার্থী হতে চান তাদের নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তবে এখনও প্রথম দফায় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। যদিও প্রত্যাহারের শেষ দিন ২২ এপ্রিল, তার আগে কীভাবে ব্যবস্থা নেব। আওয়ামী লীগের এই সিদ্ধান্তে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ খুশি হয়েছে। একটা দলে আমি এমপি, আমি মন্ত্রী, আবার আমার ভাই, ছেলে এরাও পদ নিয়ে যাবে সব, তা হলে তৃণমূলের কর্মীরা কী করবে? তাদের পদে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই? সে সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, মূল কথা হলো, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা যাতে বঞ্চিত না হন, তার জন্য দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনরা অংশ নিতে পারবেন না। আর কেউ অংশ নিলে এমপি-মন্ত্রীসহ যারা প্রার্থী হবেন, তারাও দলীয় পদ-পদবী থাকলে দল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী চান উপজেলা নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক। যাতে কোনো এমপি-মন্ত্রী নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে না পারেন। সে কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, আসন্ন উপজেলা নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন, কোনো মন্ত্রী-এমপির স্বজনরা ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না। কারণ তাদের স্বজনরা প্রার্থী হলে তারা তাদের জিতিয়ে আনতে প্রভাব খাটাবেন। এতে দলের তৃণমূলে দ্বন্দ¦ যেমন বাড়বে তেমনই সংঘাত ও সহিংসতাও বাড়বে। আর যারা এই নির্দেশনা মানবেন না তাদের বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা নেবে।







































