
মো. মুরাদ মৃধা, রাণীনগর
নওগাঁর রাণীনগর এবং আত্রাই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ইন্টারনেটের বিস্তারে মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। তবে এই ডিজিটাল বিপ্লবের হাত ধরে আসা ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক যেমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, তেমনি তরুণ প্রজন্মের জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় আশঙ্কার কারণ। প্রযুক্তির এই অনিয়ন্ত্রিত আসক্তির সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাদক ও নৈতিক অবক্ষয়, যা অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আগামী প্রজন্মকে।
অন্যদিকে একসময়কার পিছিয়ে পড়া এই জনপদে ফেসবুক ব্যবহার করে স্থানীয় উদ্যোক্তারা হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও পোশাক বিক্রি করে নিজেদের স্বাবলম্বী করছেন। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো জরুরি রক্তদান ও আর্তমানবতার সেবায় প্রযুক্তির সফল ব্যবহার করছে।
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও এখন মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের দ্বারে। কিন্তু এই ইতিবাচক দিকগুলো ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে এর নেতিবাচক প্রভাব।
হাতছানি দিচ্ছে ‘ডিজিটাল ড্রাগ’
স্মার্টফোন আর সস্তা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়ারা। পড়াশোনার চেয়ে ভিডিও তৈরি ও চ্যাটিংয়ে তাদের সময় কাটছে বেশি।
স্থানীয় অভিভাবকরা আক্ষেপ করে বলেন, "আগে বিকেলে খেলার মাঠে মুখর থাকত কিশোররা, এখন সবাই ঘরের কোণে মোবাইলে আবদ্ধ।" পড়াশোনার কথা বললে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উগ্র আচরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে অভিভাবকদের।
শলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাসুদ রানা জানান, শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃজনশীলতা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। ক্লাসে তারা আগের মতো মনোযোগী নয়। অতিরিক্ত ডিভাইস অপব্যবহারের ফলে তাদের মধ্যে ধৈর্য কমছে এবং তৈরি হচ্ছে খিটখিটে মেজাজ।
সরেজমিনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, টিফিনের বিরতি বা ছুটির পর শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে টিকটক ভিডিও বানাতে ব্যস্ত। গভীর রাত অবধি মোবাইল অপব্যবহারের ফলে তারা যেমন ক্লাসে অনিয়মিত, তেমনি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত।
বিশ্লেষকরা মনে করেন স্মার্টফোন অনিয়মতান্ত্রিক আসক্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে মাদকের মরণ নেশা। অনলাইনে বিভিন্ন নেতিবাচক গ্রুপের মাধ্যমে কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে। মোবাইল গেমসের টাকা জোগাড় বা ইন্টারনেটের খরচ মেটাতে অনেক শিক্ষার্থী জড়িয়ে পড়ছে ছোটখাটো অপরাধে, যা পরবর্তীতে তাদের মাদকের দিকে ধাবিত করছে।
নওগাঁ জেলা শিক্ষক সমিতির সাধারন সম্পাদক এবং মধুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল গফুর প্রামানিক বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা ধ্বংসের মুখে। মাত্র ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এর সঠিক ব্যবহার করছে। উচ্চ মাধ্যমিকের আগে স্মার্টফোন ব্যবহার তাদের মেধা বিকাশে বড় বাধা। এর সাথে মাদক যুক্ত হওয়া মানে একটি পুরো প্রজন্মের মৃত্যু।”
বর্তমানে বিভিন্ন বাজারের মোড়ে মোড়ে বা নির্জন স্থানে কিশোরদের দলবেঁধে মোবাইলে মগ্ন হয়ে থাকতে দেখা যায়। এই আসক্তি কেবল পড়াশোনা নয়, তাদের পারিবারিক বন্ধনকেও শিথিল করে দিচ্ছে।
ইন্টারনেটে জুয়ার সহজলভ্যতা তরুণদের নৈতিকতাকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ।
একই সাথে মাদকের সহজলভ্যতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
সঠিক তদারকি ও সচেতনতা না এলে আগামী দিনে এক ভয়াবহ মেধা সংকটে পড়বে দেশ—এমনটাই মনে করছেন এলাকার সচেতন মহল
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই 'ডিজিটাল ড্রাগ' এবং প্রকৃত মাদক থেকে বাঁচাতে প্রশাসন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মিলিত উদ্যোগ এখনই প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।























