
স্টাফ রিপোর্টার:
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম ঘনিয়ে এলেও এবার কৃষকের মুখে নেই স্বস্তির হাসি। শ্রমিক সংকট,বাড়তি মজুরি, জলাবদ্ধতা ও বজ্রপাতের আতঙ্ক মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে কৃষকদের।
২০২৪–২০২৫ ও ২০২৫–২০২৬ বোরো মৌসুমের তথ্য অনুযায়ী, তাহিরপুর উপজেলায় ২৩টি ছোট-বড় হাওরে প্রায় ১৭ হাজার ৪৩৯ থেকে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৬৮ হাজার ৬১৮ থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের এমন বড় লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে মাঠে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
কৃষকরা জানান,আগের বছরের তুলনায় এবার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম। যারা কাজ করছেন,তারাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মজুরি দাবি করছেন। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছেন তারা। এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় জমিতে পানি জমে থাকায় ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামের কৃষক কপিলনুর মিয়া বলেন,আমি ১২-১৪ কেয়ার জমিতে ধান রোপণ করেছিলাম। কিন্তু এখন শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে পাকা ধান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। সময়মতো ধান কাটতে পারবো কি-না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
একই গ্রামের দরিদ্র কৃষক তছদ্দুল মিয়া বলেন,ঋণ করে ৫-৬ কেয়ার জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করেছিলাম। ফসল তুলে সারাবছর স্বস্তিতে দিন কাটাবো—এমনটাই আশা ছিল। কিন্তু এখন যে অবস্থা, বাপ-বেটা দু’জন মিলে ধান কেটে শেষ করা সম্ভব না। বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা বাড়ছে, অনেক জমির ধান তলিয়ে গেছে। শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় কীভাবে ফসল ঘরে তুলবো বুঝে উঠতে পারছি না। ঋণের বোঝা হয়তো থেকেই যাবে।
তাহিরপুরসহ পার্শ্ববর্তী হাওর এলাকার কৃষকদের অভিযোগ,ধান পাকতে শুরু করলেও পর্যাপ্ত শ্রমিক না পাওয়ায় সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বজ্রপাতের ঘটনায় মাঠে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে করে শ্রমিক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
এদিকে বোরো আবাদে ব্যবহৃত উফশী ও হাইব্রিড জাতের ধান (ব্রি-৯২, ৯৬, শক্তি-১, ২) ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও সময়মতো ধান কাটতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। ফসল রক্ষায় ৮৭টি পিআইসি’র মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও শ্রমিক সংকট নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত শ্রমিক সংকট নিরসন, পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে হাওরের বোরো ধান নিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
হাওরের বুকজুড়ে সোনালি ধান দোল খাচ্ছে, কিন্তু সেই স্বপ্নঘেরা মাঠেই এখন কৃষকের চোখে দুশ্চিন্তার ঘন মেঘ।
































