
গালিবা আনতারা সোয়ারা:
বিশ্বব্যাপী ১০ অক্টোবর স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। স্তন ক্যান্সার একটি আতঙ্কের নাম। এই ক্যান্সার নারীদের নীরব ঘাতক বলা হয়ে থাকে। একে মরণব্যাধি, ঘাতকব্যাধি বা কালান্তর ব্যাধিও বলা হয়। এটি যুদ্ধ, দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে। পার্থক্য হলো, দুর্যোগ কিছু সময় পর থেমে যায়, কিন্তু ক্যান্সার প্রতিনিয়ত জীবন কেড়ে নেয়।
ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর কারণ হিসেবে সারাবিশ্বে স্তন ক্যান্সারের অবস্থান দ্বিতীয়; শীর্ষে ফুসফুসের ক্যান্সার। WHO-এর মতে, প্রতি ৮ জন মহিলার মধ্যে ১ জনের স্তন ক্যান্সার হতে পারে, আক্রান্ত প্রতি ৩৬ জন নারীর মধ্যে ১ জনের মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি ৬ মিনিটে একজন নারী আক্রান্ত হন এবং ১১ মিনিটে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন নারী মারা যান। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৩ হাজার নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। প্রতিবছর মৃতের সংখ্যা প্রায় ৬,৭৮৩ জন নারী। দেশের স্তন ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ নারী, ২ শতাংশ পুরুষ।
পরিসংখ্যানটি খুবই ভয়াবহ, কিন্তু এখানেই সচেতনতার অভাব। যেখানে ৬ মিনিটে একজন আক্রান্ত হচ্ছেন, তবুও কেন যেন এই রোগকে অনেকেই গোপন রোগ হিসাবে দেখেন। সামাজিক প্রথা বা ধর্মীয় সংস্কৃতির কারণে আমাদের দেশের অনেক নারীই স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতন নন। এমনকি এই বিষয়ে আলোচনাতেও আগ্রহী নন অনেকে। খুব কম নারী আছেন যারা এই রোগটির কথা মুখ ফুটে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারেন। এটি একটি জটিল সমস্যা, তবুও তারা সচেতন নন। এজন্য বাংলাদেশে ১০ অক্টোবরকে স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস হিসাবে পালন করা হয়, যার প্রতিপাদ্য বিষয় — “জেগে উঠুন, জেনে নিন”।
প্রতিবছর অক্টোবর মাস নারীদের স্মরণ করিয়ে দেয় — নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের যত্ন নিন, নিজের শরীর নিয়ে ভাবুন, নিজেকে নিয়ে সচেতন হোন। রোগমাত্রই চিকিৎসার দাবি রাখে; নারীর রোগ, গোপন রোগ বলে কিছু নেই। শরীরটা আপনার, এই জীবনও আপনার। তাই নিজের জন্য যেটা সবচেয়ে ভালো, তা গ্রহণ করতে কখনো দ্বিধা করবেন না।
স্তন ক্যান্সার কী?
স্তন ক্যান্সার হলো একটি মারাত্মক রোগ, যেখানে স্তনের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সাধারণ কোষগুলো নিয়মিতভাবে বিভাজিত হয় এবং পুরোনো কোষগুলো মারা যায়। কিন্তু যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত হয়ে টিউমার সৃষ্টি করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে টিউমার শুধুমাত্র স্থানীয় থাকতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে রক্তের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্তনের দুধবাহী নালী বা গ্রন্থির কোষ যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে তখন ক্যান্সার হয়। প্রথমে ছোট গুটি বা চাকা দেখা যায়, পরে ধীরে ধীরে বড় হয় এবং বগল বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে মনে রাখতে হবে, এই গুটি বা চাকা সাধারণত ব্যথাহীন। ব্যথা না থাকায় রোগীরা দেরিতে ডাক্তারের কাছে যান। তাই ব্যথাহীন চাকা বা গুটি অনুভব হলে তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। বেশি দেরি হলে স্তনে ঘা হতে পারে অথবা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যেতে পারে — যেমন লিভারে ছড়ালে জন্ডিস, হাড়ে ছড়ালে তীব্র কোমর ব্যথা, ফুসফুসে ছড়ালে শ্বাসকষ্ট, ব্রেইনে ছড়ালে তীব্র মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
স্তন ক্যান্সার কাদের বেশি হয়?
যদিও বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু যে কোনো বয়সের মহিলাই এতে আক্রান্ত হতে পারেন। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিকে দুইভাবে ভাগ করা যায় — অপরিবর্তনযোগ্য ও পরিবর্তনযোগ্য।
অপরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকিগুলো মূলত বয়সভিত্তিক, জিনগত ও বংশগত; যেগুলোর পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কারো পরিবারের নিকট আত্মীয় যেমন মা, খালা, ফুফু, বড় বোন বা মেয়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকলে, তাদের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় তিন-চারগুণ বেশি।
পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকিগুলোর মধ্যে আছে — স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন, মদ্যপান, ধূমপান, দীর্ঘ সময় ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহার, বেশি বয়সে সন্তান নেওয়া, সন্তানকে দুই বছর পর্যন্ত বুকের দুধ না খাওয়ানো ইত্যাদি।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
স্তন ক্যান্সারের বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে — যেমন: সার্জারি, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ইত্যাদি। সার্জারি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে; পুরো স্তন কেটে অপারেশন করা যায়, আবার পুরো না কেটে শুধুমাত্র চাকা বা গুটি কেটেও অপারেশন করা যায়।
ভীত না হয়ে, আসুন আমরা সবাই সচেতন হই। স্তন ক্যান্সারের ভয়াবহতা থেকে নিজে বাঁচি এবং অন্যকেও বাঁচাই।
স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং-এর তিনটি ধাপ রয়েছে। স্ক্রিনিংয়ের উদ্দেশ্য হলো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা ও চিকিৎসা সহজ করা। প্রথম অংশটি হলো (BSE / Breast self Exam) প্রতিমাসে পরিয়ড হওয়ার ৭দিন পর নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করা এবং চাকা বা গোটা অনুভব হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া। দ্বিতীয় (CBE/ Clinical Breast Exam) যেখানে ডাক্তার স্তন পরীক্ষা করবে। তৃতীয়টি হলো ম্যামোগ্রাম যা স্তানর একটি স্পেশাল এক্সরে। চল্লির্শোধ মহিলা অথবা যারা হাই রিস্ক তাদের Screening করতে হবে।
অতএব, আসুন আমরা সবাই সচেতন হই — প্রতিমাসে নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করি। এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জেতার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা।
ঝুঁকি কমানোর উপায়:
* নিয়মিত ব্যায়াম (সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন, প্রতিদিন ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম)
* সুষম খাদ্যগ্রহণ (শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার)
* মাংস ও চর্বিজাতীয় খাবার কম খাওয়া
* ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
* ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা
* পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ কমানো
* পরিবার ও সমাজে নিয়মিত পরীক্ষা করার উৎসাহ দেওয়া
বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের জানানো, তাদের সচেতন করা — এভাবেই আমরা সবাই মিলে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারি। সেই সঙ্গে, যারা এই রোগের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন — তাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও সহানুভূতি রইল। ভালোবাসা রইল স্তন ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে যাওয়া সকল যোদ্ধার প্রতি।আসুন, আমরা নিজেকে ভালোবাসি, নিজের যত্ন নিই, নিজের শরীর নিয়ে সচেতন হই।
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়







































