
কাজী মালিহা আকতার:
সেবা ব্রতী সংগঠন যুব রেড ক্রিসেন্ট শুধু মানবসেবা করে তা না, এখানে যারা কাজ করে তাদেরকে আলাদা পরিবারও দেয়। যুব রেড ক্রিসেন্ট চট্টগ্রাম কলেজ ইউনিটের সাথে কাজ করতে গিয়ে তেমনি আমিও পেয়েছি কয়েকটি পরিবার। তার মধ্যে একটি সুবিধাবঞ্চিত শিশু নিকেতন। এ পরিবারের একটি মুহূর্ত আমার কাছে রোমাঞ্চকর হয়ে থাকবে।
এ বছরে বাচ্চাদের প্রথম ক্লাস ছিল তাই দলে দলে সবাই যোগ দিল। এখনো ভর্তি হয়নি এমন বাচ্চা থেকে শুরু করে নবম শ্রেণির পর্যন্ত বাচ্চারা এসেছিল। ১৮ জানুয়ারি রোজ শনিবার চট্টগ্রাম কলেজের রেড বিল্ডিং এ তাদের ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। মূলত প্রত্যেক শনিবার যুব রেড ক্রিসেন্ট, চট্টগ্রাম কলেজ ইউনিট 'সুবিধাবঞ্চিত শিশু নিকেতন' নামে একটি স্কুল পরিচালনা করে। যেখানে দুটি বস্তি দেবপাহাড় ও ফুলবাড়িয়ার বাচ্চাদের পড়ানো হয়।
সকাল ১০ টা থেকে তাদের কার্যক্রম থাকলেও তারা এর আগেই পৌঁছে যায়। বাচ্চাদের ক্লাসের প্রতি প্রচণ্ড উৎসাহ দেখে তাদেরকে পড়ানোর জন্য আরও উদ্দীপনা জাগে। সেদিন এত বাচ্চা এসেছিল যে অনেক কষ্টে সবার জন্য জায়গা করা গিয়েছিল। এরপর তাদেরকে ক্লাস অনুসারে বসিয়ে আমরা যারা পড়াই তারা ভাগ হয়ে গেলাম। আমি বসলাম পঞ্চম শ্রেণির বাচ্চাদের নিয়ে। ওদেরকে 'হাতি ও শিয়ালের গল্প' পড়ালাম। এরপর সারসংক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করে তাদেরকে শব্দার্থ বের করতে দিয়ে সপ্তম শ্রেণির বাচ্চাদের কাছে গেলাম। ওরা শুধু দুইজন ছিল, তখন ওদেরকে বিজ্ঞান পড়ালাম।
এর কিছুক্ষণ পর বাচ্চারা কেউ কেউ পানি খেতে যেতে যাচ্ছিল। তখন লক্ষ্য করলাম পিচ্চি করে একটা বাচ্চা তাদের সাথে চলে যাচ্ছে। আমি গেলাম ওদের কাছে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? একজন বললো, ও আমাদের সাথে চলে যাচ্ছে। তখন আমি হাত বাড়িয়ে বললাম, আসো তুমি আমার সাথে। বাচ্চাটা আমার কোলে উঠে গেল আমাকে একেবারে জড়িয়ে ধরলো। আর মিষ্টি কণ্ঠে বলল, "আমার ঘুম আছছে"। আমিও জড়িয়ে ধরে কোলে নিয়ে বাকিদের পড়াচ্ছিলাম। তখন আমাদের একজন সহকর্মী একটা ফটো ক্লিক করলো।
একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ওর নাম কী? বলল, আফসানা। আমি বললাম, বয়স কত? একজন উত্তর দিল, "এখনো তিন বছর হয়নি আমার সাথে চলে এসেছে পড়তে"। সে ছিল সবচেয়ে ছোট বাচ্চা আমাদের সুবিধাবঞ্চিত শিশু নিকেতনের। বাচ্চাটা এতই মায়াবী ছিল যে আমি এখনো তার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ওর জড়িয়ে ধরাটায় মনে হচ্ছিল খুবই আপন কেউ, অনেক পরিচিত কেউ। কিন্তু সেদিনই ছিল ওর সাথে আমার প্রথম দেখা। এতো অল্প বয়সী একটা বাচ্চা এতো আবেগে জড়াতে পারে তাও প্রথম দেখায়!
কিছু কিছু মানুষ, কিছু কিছু মুহূর্ত যেমন হৃদয়ে দাগ কেটে যায় তেমনি আফসানার জড়িয়ে ধরাটাও ছাপ রেখে গেল আমার মনে। সব বাচ্চা মিলে আমার একটা পরিবার তার মধ্যে এক সদস্যের হৃদয়ে লাগানো ছোঁয়া স্পেশাল করে তুললো তাকে।
লেখক: শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
/শুভ্র






































