
আরও একটি বাংলা বছর
হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের পাতায়। পহেলা বৈশাখ মানেই এক সময় ছিল পান্তা-ইলিশের ঘ্রাণ, বৈশাখী
মেলার হুল্লোড়, আর লাল-সাদা পোশাকে রঙিন সকাল। আজকের তরুণ প্রজন্ম কীভাবে দেখছে পহেলা বৈশাখকে? শৈশবের
সারল্যে মাখা আনন্দ আর এখনকার কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যে কতটা বদলে গেছে বৈশাখ উদযাপনের
রূপ?
এই পরিবর্তনের গল্প
জানিয়েছেন কয়েকজন কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। তাদের চোখে ধরা দিয়েছে বৈশাখের এক নতুন
মাত্রা—যেখানে মিলেছে স্মৃতি, বাস্তবতা আর
সাম্প্রতিকতার ছোঁয়া।
নতুন বছরের অঙ্গীকার
নববর্ষ কথাটি শুনলে মনে জেগে উঠে
নতুনত্ব। পহেলা বৈশাখ বাঙালির এক নতুন অধ্যায়; নতুন ধানের চাল, নতুন পোশাক ও হালখাতা।
পুরোনো সকল হিসেব চুকে অভিনব ভাবে পথ চলা। নতুন বছর আমাদের কাছে এক বিশেষ বার্তা বয়ে
আনে। দুঃখ-কষ্ট-বেদনা ভুলে সকলে এক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অঙ্গীকার।
কিন্তু সময় পরিক্রমায়
নববর্ষে সেই ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। চারদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া। নববর্ষের নামে ব্যান্ড পার্টি,
গেট টুগেদার। মঙ্গল শোভাযাত্রায় অরাজকতা-অশ্লীলতা। রমনা পরিবার-পরিজনে নয় কপোত-কপোতীতে
ভরপুর। হালখাতায় পুরোনো হিসেবে ঢের। বর্ষ বরণে চলে পশ্চিমা সংস্কৃতি। আফসোস এরকম সংস্কৃতি
বাঙালির জন্য নয়।
বাঙালি সংস্কৃতি হলো আপন মনে গেঁথে
যাওয়া কাঁথার মত। যেখানে নেই কোনো অপসংস্কৃতি, আছে শুধু মায়া। সকলে মিলে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যে
তুলে ধরা। শৈশবের সোনালি দিনের মত নববর্ষ হোক বাঙালির রঙিন। সেখানে না থাকুক কোনো অশালীনতা।
“বছর ঘুরে আসুক বর্ষ, বাঙালি হোক এক আলোকবর্ষ” এই তাৎপর্য কেন্দ্র করে সবার নতুন বছর
সমৃদ্ধে কাটুক।
লেখক:
খাদিজা আক্তার সায়মা, শিক্ষার্থী, সরকারি তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ
বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্যের
অংশ
বৈশাখ এলেই মনে পড়ে শৈশবের সেই রঙিন
দিনগুলোর কথা পান্তা-ইলিশের সুস্বাদু ঘ্রাণ, লাল-সাদা পোশাকে সেজে ভাই-বোন আর বন্ধুদের
সঙ্গে বৈশাখী মেলায় যাওয়ার আনন্দ। মাটির খেলনা আর নকশা করা হাতপাখার প্রতি ছিল এক অন্যরকম
ভালোবাসা।
কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিকতার স্পর্শে,
ব্যস্ত জীবনের চাপে আমাদের সেই প্রাণচঞ্চল বৈশাখ যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন অনেকেই
ঘরে বসেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকেন। বৈশাখী মেলার জায়গা
দখল করেছে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর ‘নিউ ইয়ার স্পেশাল অফার’। ফলে নতুন প্রজন্মের শিশুরা
বৈশাখের প্রকৃত আনন্দ কী, তা ঠিকমতো বুঝতেই পারে না।
তবে সবকিছু কি সত্যিই হারিয়ে গেছে?
না, হারিয়ে যায়নি! আমরা চাইলে ফিরিয়ে আনতে পারি আমাদের শৈশবের সেই প্রাণবন্ত বৈশাখকে।
শিশুদের সঙ্গে মেলায় যাওয়া, তাদের হাতে মাটির খেলনা তুলে দেওয়া, নাগরদোলায় ওঠা, একসঙ্গে
পান্তা-ইলিশ খাওয়া—এই ছোট ছোট কাজগুলোর মাধ্যমেই আমরা
আবার জাগিয়ে তুলতে পারি হারিয়ে যাওয়া আনন্দকে।
বৈশাখ কেবল একটা উৎসব নয়, এটা আমাদের
ঐতিহ্যের অংশ। আসুন, এই উৎসবকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে তুলি, যেন আগামীর শিশুরাও রঙিন বৈশাখের
স্মৃতিতে বড় হতে পারে।
লেখক:
সাব্বির হাসান নিরব, শিক্ষার্থী, বাজিতপুর সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ।
নতুন বছর নিয়ে আসুক
ধরার মাঝে নতুনত্ব
পুরাতন বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরকে
নতুনভাবে বরণ করা হয় বৈশাখের মধ্য দিয়ে। জাতি ধর্ম-বর্ণ সকল ভেদাভেদ ভুলে প্রতিবছর
পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়।
বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই শহর ও গ্রাম
বৈশাখের রঙে রঙিন হয়ে উঠে। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি গ্রামের একটা বড় মাঠ জুড়ে বৈশাখী মেলার
আয়োজন করা হয়। সাদা-লাল শাড়ি পাঞ্জাবী পরে মেলায় ঘুরতে যাওয়া সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল।
তবে আগের মতো এখন আর পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয় না। ছোটবেলার পহেলা বৈশাখ এখন শুধু
স্মৃতির পাতায় মোড়ানো। শৈশবের সেই আনন্দ উল্লাস সব যেন বিলীন হয়ে গেছে। যুগের সাথে
তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে ইংরেজি বছরকে যেভাবে
বরণ করা হয় বাংলা বছরকে সেইভাবে বরণ করে নেয়া হয় না। পশ্চিমা সংস্কৃতিকে ধারণ করতে
গিয়ে আমরা আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভুলতে বসেছি। নব আহ্বানে জাগ্রত
হোক আমাদের বাঙালি জাতিসত্বা। ফিরে আসুক শৈশবের
সেই বৈশাখ। নতুন বছরে দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়াসে হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ
হই। যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
লেখক:
উম্মে রুকাইয়া দিনা, শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজ।
হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির
বৈশাখের উচ্ছ্বাস
প্রতি বছর উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা
নববর্ষ উদ্যাপিত হয়। বৈশাখী উৎসবে থাকে প্রাণের ছোঁয়া, থাকে উচ্ছ্বাসের বাঁধভাঙা জোয়ার।
শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সের সব শ্রেণি মানুষ এ দিনটি উদ্যাপন করে। বাংলা নববর্ষ বাঙালির
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান উপাদান।
বাংলা নববর্ষের আনন্দ ও আমেজ অনেকটাই
বর্তমানে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ের নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ভাত ও ইলিশ ভাজাসহ মুখরোচক
অনেক খাবারের সমারোহ ঘটলেও এতে প্রাণের স্পর্শ পাওয়া যায় না। এসব বিলাসী মানুষের বিনোদনের
ব্যবস্থামাত্র। আধুনিক যুগের শহরের মানুষের প্রাণহীন জমকালো বর্ষবরণে হারিয়ে যাচ্ছে
নিবিড় পল্লির প্রীতিপূর্ণ ছোট ছোট উৎসবগুলো। বড়োলোকি মনোভাবের কাছে বাঙালি পুরনো উৎসবেরও
রূপ বদলে গেছে।
লেখক:
উম্মে সালমা, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।







































