
জ্বালানির জ্বালা পৌঁছে গেছে ট্রেনে। তেলসংকটে ভুগছে রেল। নিয়মিত সরবরাহ ঘাটতিতে টান পড়েছে মজুদে। এর মধ্যে তলানিতে চলে গেছে সংগ্রহও। এক মাসের মজুদ নেমেছে সাত দিনে। ধীরে ধীরে বন্ধের উপক্রম হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় এই গণপরিবহন।
ইরানে চাপিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসসংকটে পড়েছে পুরো বিশ্ব। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চমকপ্রদ পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তান। তেলের খরচ কমাতে গণপরিবহন ফ্রি করেছে দেশ দুটির রাজধানীসহ জনবহুল অঞ্চলগুলো। তবে উল্টোচিত্র দেখা যেতে পারে বাংলাদেশে।
রাজনীতির মাঠ থেকে সংসদ— সবখানেই সরকারের কর্তাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে দেশে সংকট নেই জ্বালানির। কিন্তু বাস্তবে কমছে না বিভিন্ন পাম্পে গ্রাহকের দীর্ঘ সারি। তেলের দাম বাড়লেও তেমন উন্নতি ঘটেনি সরবরাহে। এবার টান পড়েছে ট্রেনের চাকায়, এভাবে চলতে থাকলে একে একে বন্ধ হতে পারে রেলসেবা। সামগ্রিক বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলের একাধিক দপ্তরের কর্তার সঙ্গে খোলামেলা আলাপ হলো আগামীর সময়ের। উঠে এলো ট্রেনের জন্য তেলের চাহিদা, জোগান ও মজুদের বিদ্যমান চিত্র।
রেলকে তেল দেয় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটি দৈনিক খরচের ভিত্তিতে সরবরাহ করে তেল। এর বাইরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ রেলের বিভিন্ন ডিপোতে নিয়মিত মজুদ থাকে এক মাসের জ্বালানি। সরবরাহ ঘাটতির কারণে তা নেমেছে কোনো কোনো ডিপোতে সাত, কোনোটিতে ১০ দিনে। প্রতি সপ্তাহে একবার রেলকে ১২ লাখ লিটার তেল দেয় বিপিসি। ট্রেনে সরাসরি পাঠানো হয় দুই অঞ্চলে; পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে। সেখান থেকে বিভিন্ন ডিপোতে করা হয় সংরক্ষণ। সারা দেশে ট্রেন চালাতে প্রতিদিন গড়ে প্রয়োজন হয় এক লাখ লিটার তেল। আর এক লিটার তেলে গড়ে ৩ দশমিক ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে একটি গাড়ি।
সংকট শুরুর পর থেকে ১০ শতাংশ করে কমছে সরবরাহ। দুই সপ্তাহে ২০ শতাংশের বেশি কমায় তা এখন নেমে গেছে দিনের চাহিদার অনেক নিচে। বাধ্য হয়ে ভাঙছে পুঁজি, তলানিতে যাচ্ছে মজুদ। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেন চলাচল বন্ধ করার কথা ভাবছে রেল কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে সবার আগে গতি থেমে যেতে পারে ‘কম গুরুত্বপূর্ণ ছোট’ ট্রেনের। আগামীর সময়কে এ তথ্য দিলেন খোদ রেলের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন। ‘তেলের সরবরাহ যদি এমনই থাকে, তাহলে সর্ব্বোচ ১৫ দিন চলবে ট্রেন। এরপর একে একে গতি থেমে যাবে সব চাকার। শুরুতে বন্ধ হবে ছোট রুটের ট্রেনগুলো’— যোগ করলেন তিনি।
ট্রেন বন্ধের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের কোনো তালিকা তৈরি হয়েছে কি না, জানতে চাইলে এক কথায় উত্তর দিলেন— ‘না’। কণ্ঠ খানিকটা নিচু করে তিনি জানালেন, কিন্তু ট্রেন বন্ধ করা ছাড়া তো আর কোনো উপায় থাকবে না। গুরুত্ব দিয়ে রেলে তেলের সরবরাহ বাড়ানো দরকার।
‘ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে একটা গাড়ির ১০০ লিটার তেল প্রয়োজন হলে তাতে যাতায়াত করতে পারে কিছু মানুষ। অন্যদিকে ট্রেনে একসঙ্গে হাজারো মানুষ যেতে পারে’— গণপরিবহনের গুরুত্ব তুলে ধরলেন আফজাল হোসেন।
এদিকে বিপিসির কাছে তেলের বিল বাবদ নিয়মিত গড়ে ১০০ কোটি টাকা বকেয়া থাকে রেলের। হঠাৎ করে সেই বকেয়া ৩০০ কোটিতে ঠেকেছে। এই পাওনা চলতি অর্থবছরে শোধ করতে পারবে না রেল। এর জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে আগামী অর্থবছরে বাড়তি বরাদ্দের দিকে।
































