
পুনর্জন্মে যদি দেখা হয়
মো. সেলিম হাসান দুর্জয়
ঢাকার বেইলি রোড়ের পুরনো গলির শেষে দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা ভবনটা বেশ ক্লান্ত দেখায়। ভাড়া তুলনায় কম, কিন্তু বাসার কাঠের দরজা, উঁচু ছাদ, খোদাই করা জানালাগুলো কিছু পুরনো গল্পের ইঙ্গিত দেয়। এমন এক ঘরেই উঠে আসে আরিব—নবীন কবি, সদ্য মাস্টার্স শেষ করে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছে। তার চোখে ঘুমহীনতা, মনে রাত্রির রোদ।
প্রথম রাতেই সে টের পায়, ঘরের এক কোণে কাঠের একটা বক্স—দুধ-রঙা কাপড়ে মোড়া, উপরে ধুলোর আস্তরণ, চারপাশে পোকায় কাটা। কৌতূহলে সে টেনে আনে বক্সটা। খোলে।
ভেতরে পাওয়া যায়— পুরনো এক ছবি: একজন তরুণী, সাদা শাড়িতে, খোলা চুলে হাসছেন।
চিঠি, পোস্টকার্ড—তারিখ ১৯৭০–৭১। আর একখানা ডায়েরি—নীলাভ কাভার, ভিতরে প্রথম পাতায় লেখা:
"আমি মীরা সেন। যদি হারিয়ে যাই—এই পৃষ্ঠাগুলোই আমার একমাত্র পরিচয়।"
আরিব যেন হতচকিত হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ।
এই নাম সে কখনো শোনেনি, তবুও এক ধরনের টান যেন জমে যায় বুকের ভেতর।
ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠা:
২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১
আজ শহীদ মিনারে গিয়ে দাঁড়ালাম। মানুষের মুখে মুখে ভাষা, প্রতিবাদ, কষ্ট, আর প্রার্থনা। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম একজন ছেলে দিকে —তার চোখে যেন আগুন জ্বলছিল, কিন্তু মুখে এক টুকরো শীতল হাসি।
সে আমায় লক্ষ্য করেছিল কি? জানি না। কিন্তু আজ আমার ডায়েরি শুরু হলো তার নামহীন উপস্থিতি দিয়ে।
আমি জানি না তার নাম, তার পরিচয়। শুধু জানি, এই শহরে কেউ আছে, যার চোখে আমি নিজেকে খুঁজে পাই।
আরিব ডায়েরি বন্ধ করে। ঘরে সাদা আলো ছড়ায়, বাইরে একটা কাক ডেকে ওঠে।
ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় সাড়ে তিন।
নীরব রাত্রির ভেতরেও ঘরের বাতাস যেন সাড়া ফেলে দেয়। আরিব কাঁধে কম্বল জড়িয়ে জানালার ধারে বসে। হাতে মীরার ডায়েরি।
সে এক নিঃশব্দ পাঠক—যার চোখ দিয়ে একাত্তরের ছায়া প্রবেশ করে আজকের দিনে। ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলো থেকে সে যতই পড়ে, ততই যেন সময়ের পর্দা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে কোনো এক প্রাচীন গল্পে। সে বোঝে না কেন, কিন্তু মীরার প্রতিটি শব্দে তার নিজের আত্মার প্রতিধ্বনি শুনতে পায়।
সে চোখ বুজে।
চারদিকে এক অচেনা গ্রাম—তবু মনে হয় চেনা।
ধানের গন্ধ, পাখিদের ডাক, আর দুপুরের রোদ্দুরে সোনালি আলো।
আরিব হাঁটছে। পায়ের নিচে কাঁচা পথ, পাশে দোয়েল উড়ে যায়। তখনই দূরে এক গাছতলায় সে দেখে—একটা মেয়ে বসে আছে। সাদা শাড়ি, খোলা চুল, হাতে একটা বই। মেয়েটি তাকায়। চোখে যেন শতাব্দীর চেনা ক্লান্তি।
আরিব থেমে যায়।
— তুমি মীরা?
— তুমি তো অনেক দেরি করে ফেললে।
— তুমি... জানো আমি কে?
— জানি না। কিন্তু আমার ডায়েরি তুমিই খুঁজে পাবে, সেটা জানতাম।
মেয়েটির কণ্ঠে জলধ্বনির মতো কিছু—বয়ে যায় নীরবতা।
— আমি কি স্বপ্নে আছি?
— স্বপ্ন যদি হয়, তবে এটাও তো সত্যি হতে পারে...
— কেন তোমার বারবার মনে হচ্ছে , আমি তোমায় আগে কোথাও দেখেছি?
— হয়তো দেখেছো। হয়তো জন্মান্তরে... হয়তো এই ইতিহাসেই।
আরিব এগিয়ে আসে। সে হাত বাড়ায়। কিন্তু স্পর্শের আগেই মীরা হারিয়ে যায় বাতাসে। পেছনে পড়ে থাকে তার একটি শব্দ—পাঠশালার ছাদে এসো। কাল দুপুরে।
আরিব ঘুম ভেঙে উঠে বসে। তার বুক ধড়ফড় করছে। সে জানে—এটি কেবল স্বপ্ন নয়। এটি কোনো আহ্বান।
আরিব জেগে উঠেছে ভোরের ঠিক আগে।
ঘরের বাতাসে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ—কেমন যেন ধানের গন্ধ, কুয়াশার মতো মিষ্টি। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে, ডায়েরির শেষ পাতাটি আবার পড়ে:
“যদি কেউ একদিন আমার ডায়েরি পড়ে, যদি তার চোখে আমার গল্পের শীতলতা ধরা দেয়,
তবে সে নিশ্চয় জানবে—একটা ছাদ ছিল।
একটা ছাদ, যেখানে আমি অপেক্ষা করতাম।”
— মীরা সেন, ২৫ মার্চ ১৯৭১
২৫ মার্চ… শব্দটা বুকের ভিতর ধাক্কা মারে। আরিব জানে কী হয়েছিল সেই রাতে। আর এই মেয়েটি—মীরা—যদি নিখোঁজ হয় ঠিক তার আগের দিনে?
সে বেরিয়ে পড়ে।
পুরনো বইপাড়ায় খবর নেয়, মীরা সেন নামে কি কেউ থাকতেন এই এলাকায়?
কেউ মাথা নাড়ে, কেউ ভাবে—মীরা? না ভাই, জানি না তো।
এক বৃদ্ধ পত্রিকা বিক্রেতা বলে—
মীরাদির কথা কুয়াশার মতো। যুদ্ধের আগে এখানেই একটা পাঠশালা ছিল—বিজ্ঞান বালিকা বিদ্যালয়।
শুনেছি, সেখানকার একজন শিক্ষিকা কোনো এক রাতে হারিয়ে যান।
কেউ বলে—পাক সেনারা তুলে নেয়, কেউ বলে—উনি নিজেই উধাও হয়ে যান, চিরতরে।
আরিবের গা শিউরে ওঠে। সে ছুটে যায় সেই স্কুলের খোঁজে।
একটি জরাজীর্ণ ভবনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় আরিব।
ইট ভাঙা, জানালায় কাচ নেই, ছাদে জং ধরা শিক।
তবু তার বুক বলে—এইখানেই ছিল সেই ছাদ।
সে উঠে যায় সিঁড়ি বেয়ে—পায়ের নিচে কাঁচা শব্দ, ধুলো জমা। ছাদে উঠে দাঁড়ায় সে। আকাশ নীল। বাতাস থমথমে। দূরে কাক ডাকে।
হঠাৎ সে দেখল—এক কোণে রাখা একটা পাথরের টেবিল, তার ওপর মিশে যাওয়া অক্ষরে লেখা:
- আমার অপেক্ষা রইল...
আরিব ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। ঠিক তখনই এক হাওয়ার দমকা ঝাপটা দেয়। আরিবের চোখে পড়ে যায় কিছু শুকনো পাতার নিচে ঢাকা থাকা—এক টুকরো কাগজ। সে কুড়িয়ে তোলে।
চিঠি।
মীরা সেনের হাতের লেখা।
“যদি কেউ একদিন এখানে আসে, তবে জেনে নিও—ভালোবাসা কখনো মরে না। কেউ যদি সত্যি ভালোবাসে, তবে সে ছুঁয়ে যেতে পারে সময়ের গায়ে আঙুল রেখেও।”
আরিব থমকে যায়। চিঠিটি ছিল হাতে লেখা—কিন্তু কাগজের পিঠে সময়ের ছাপ। মটমটে, হলদে, কোনায় একবিন্দু শুকনো রক্তের দাগ—নাকি তা ছিল পুরনো স্যাঁতসেঁতে?
আরিব পড়তে শুরু করে।
চিঠি (তারিখ নেই):
“প্রিয়,
আমি জানি না তুমি কে।
তুমি আমার শ্রেণিকক্ষে এসেছো কি না, কিংবা শহিদ মিনারে আমায় একবার দেখেছো কি না, তবু আমি বিশ্বাস করি—তুমি এসেছিলে।
হয়তো একদিন তুমি আমার হাতে ধরা কলম হয়ে উঠেছিলে, কিংবা অজানা একটা কবিতার পঙ্ক্তি।
আমি বুঝিনি তখন, কিন্তু এখন যখন আশপাশে যুদ্ধের শব্দ, বন্দুকের গর্জন, তখন আমার ভেতরে তুমি ফিরে ফিরে আসছো।
যদি আমি হারিয়ে যাই, যদি ইতিহাসের পাতায় আমার নাম না থাকে— তবু তুমি লিখে নিও।
আমি ভালোবেসেছিলাম।
আমি কারো অপেক্ষায় ছাদে দাঁড়িয়েছিলাম।
আর আমি জানতাম—সেই কেউ, একদিন ঠিক আসবে।”
— মীরা
আরিবের হাত কাঁপছে। চিঠির ভাষা যেন তার ভেতর কেঁপে ওঠা আত্মার ভাষা। সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে,
আমি কি সেই কেউ?
আমি কি জন্মান্তরের কোনো প্রতিশ্রুত মানুষ—যার কাছে এই চিঠি পৌঁছাবার ছিল?
চিঠির নিচে আরেকটি বাক্য আলতো কাঁপা হাতে লেখা:
“তুমি যদি সত্যিই আসো, তাহলে খুঁজে নিও ‘কাঞ্চনা গ্রামের তালতলা মাঠ’।
সেখানে আমার একটা গাছ ছিল, আর একটা নাম...
আরিব রাতেই গুগল ঘেঁটে, মানচিত্র ঘুরিয়ে খুঁজে পায় একটি ছোট্ট জায়গা- কাঞ্চনাগ্রাম, চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রাম। তালতলা নামে একটা মাঠও আছে সেখানে।
সে সিদ্ধান্ত নেয়—পরদিন সকালেই রওনা দেবে।
সে জানে না সে কি যাচ্ছে ইতিহাস খুঁজতে, না আত্মপরিচয়। তবে একটু করো সত্য তার বুকজুড়ে দোলা দিচ্ছে:
ভালোবাসা সময়কে ছুঁয়ে যেতে পারে।
বাস থেকে নামার মুহূর্তেই আরিবের মনে হলো—এই জায়গা তার চেনা। হয়তো কোনো জন্মের ঘুমে এই পথ সে হেঁটে এসেছে।
কাঞ্চনা গ্রাম শান্ত, ছায়াময়। মধ্যকাঞ্চনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরিয়ে বাঁপাশের ইটের ছলিং বিছানো মায়াময়ী পথ।
বিকেলের আলো নরম। বাতাসে কুড়মুড়ে খড়ের গন্ধ।
আরিব হাঁটে। সে কারো স্নিগ্ধ পায়ের হেঁটে চলার ছন্দ শুনতে পায়। খুব পরিচিত, আপন সে ছন্দ। যেন জন্মান্তরের সেই শরীরঘেঁষা চন্দন সুবাস। একটা তালগাছের মাথা দূরে দেখা যাচ্ছে। কালি মন্দির পেরোতেই পথে পড়ে এক মুদি দোকান। চা বানাচ্ছেন এক বৃদ্ধা।
— মা, তালতলা মাঠ কোন দিকে?
— ওই যে দূরে তালগাছ দেখছো? ওটাই।
- তুমি শহর থেকে এসেছো বুঝি?
— হ্যাঁ। একটা খোঁজে এসেছি।
— কাঞ্চনাগ্রামে এখন আর কেউ কিছু খোঁজে না, বাবা।
কেবল পুরনোদের স্মৃতি রয়ে গেছে।
- সেটা কেমন?
- ও মাঠে একটা মেয়ে বসত এককালে। খুব সুন্দর মেয়ে। আলো নিয়ে এসেছিল। স্বচ্ছ আলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া, এই গ্রামের প্রথম আলোকিত নারী।
- তার নাম জানেন আপনি?
- মীরা।
আরিব চমকে ওঠে।
— আপনি... মীরাকে চিনতেন?
— চিনতাম না, দেখেছি।
রোজ বিকেলে সে ওখানে বসতো।
কারও জন্য অপেক্ষা করত। তারপর হঠাৎ একদিন... আর এল না।
— কেউ জানে না সে কোথায় গেছে?
— কেউ না। কেবল তালতলার বাতাস জানে।
সেই মাঠ শুনশান। একফালি নরম রোদ ছড়িয়ে আছে।
তালগাছের গায়ে একটা দাগ কাটা—
তার নিচে খোদাই করা: - আসবে বলেছিলে, এলে?
আরিব বসে পড়ে গাছের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে। তার বুকের ভেতর ধুকপুক করে ওঠে হারিয়ে যাওয়া কিছু সুর।
ঠিক তখনই— একটা মেয়ে তার পাশে এসে বসে। সাদা জামদানি, খোলা চুল, গালে তিল।
— তুমি… তুমি কে…?
মেয়েটি তাকায়। চেনা সেই চোখ।
— আমি এখনো অপেক্ষা করছি।
তুমি কি সত্যিই ফিরে এসেছো?
আরিব কথা হারিয়ে ফেলে। বুক কাঁপে। সময় স্থির হয়ে যায়।
— তুমি কি… মীরা?
— আমি সেই মনের প্রতিচ্ছবি… যে মীরাকে তুমি খুঁজে চলেছো, আমি তার ছায়া। কিন্তু তুমি যদি মনে রাখো…
সে হারায় না, সে ফিরে আসে বারবার। তোমার ভিতরেই।
মেয়েটি হেসে উঠল। তার হাসিতে জোনাকির আলো।
তারপর সে উঠে চলে যায়—ধীরে, তালগাছের পেছনে।
আরিব ছুটে যায়, কিন্তু সেখানে কেবল বাতাস, তালপাতা, আর নিঃসঙ্গ রোদ।
সে একা দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু জানে—সে আর একা নয়।
ঢাকায় ফিরে আসার পরের রাতগুলো আর আগের মতো থাকল না। আরিবের ঘুম আসত না। চোখ বন্ধ করলেই তালতলার সেই ছায়া মেয়েটির মুখ ফুটে উঠত।
তাকে ছুঁতে চেয়েও ছুঁতে না পারার সেই মুহূর্ত যেন চামড়ার নিচে বেঁধে যায়।
তার কানে বাজতে থাকত সেই শেষ প্রশ্ন—
- তুমি কি সত্যিই ফিরে এসেছো?
তালগাছের গায়ে হাত বোলানোর সময় সে যে কাগজটি পেয়েছিল, সেটা সে তখনও খুলে পড়েনি।
এখন গভীর রাত, সে মোমবাতি জ্বেলে কাগজটি খুলে।
সাদা কাগজে হালকা অক্ষরে লেখা:
"যদি আমার কিছু লেখা থেকে যায়, কেউ সেগুলো জোড়া লাগাতে পারে…
তবে সে-ই আমার জন্য উপযুক্ত প্রাপক।
আমি কিছু কবিতা রেখে গেছি কৃষ্ণতারা পাঠশালার পাণ্ডুলিপি ঘরে।
কিন্তু কেউ খুঁজে পাবে কি?”
নিচে লেখা— “বিশ্বাস যদি সত্য হয়, পুনর্জন্মও হয়তো শুধু কল্পনা নয়।”
আরিব এবার নতুন প্রশ্নে জর্জরিত হয়—
কৃষ্ণতারা পাঠশালা আবার কোথায়?
এটা কি মীরার রেখে যাওয়া আরেক ক্লু?
আর সেই ‘পাণ্ডুলিপি ঘর’—সেখানে কী আছে?
রাত দেড়টার দিকে আরিবের ঘুম আসল।
কিন্তু এবার আর স্বপ্ন নয়, যেন কোনো এক স্মৃতি ফিরে এলো।
সে দেখল—
এক যুদ্ধকালীন সময়। মাটির ঘর। সে দাঁড়িয়ে আছে, কাঁধে একটা বইয়ের ব্যাগ, চোখে গভীর দৃঢ়তা।
আর মীরা তার সামনে কাঁদছে।
— তুমি যেও না... প্লিজ। আরিব মির্জা আর মীরা সেন, কত সংগ্রাম আর প্রতিকূলতা শেষে...
মীরার চোখে জল, এক অবিনশ্বর আনুগত্যের ঢেউ
— আমি ফিরে আসব, মীরা।
— যদি না আসো?
— তবে আমি আবার আসব। অন্য কোনো জন্মে।
আর তখন তুমি থাকবে, আমি তোমায় খুঁজে নেব।
ঘুম ভেঙে যায়। আরিব ঘামছে। বুক ধড়ফড়।
সে ধীরে বলে উঠে—
আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম… আমি ফিরব।
সে জানে, এবার তাকে খুঁজে বের করতেই হবে—
কৃষ্ণতারা পাঠশালা।
কারণ ওটাই হতে পারে সেই কেন্দ্র—যেখান থেকে হারিয়ে যাওয়া মীরা নিজের কাব্য, প্রেম, আর অস্তিত্বের সমস্ত বেদনা রেখে গেছে।
নির্ঘুম রাত পেরিয়ে সকাল।
আরিব যেন ঘুমেই ঠিক করে নেয় সিদ্ধান্ত—
এবার তাকে যেতে হবে উত্তরাঞ্চলের সেই ছোট্ট শহরে, যেখানে কোনো এককালে ছিল কৃষ্ণতারা পাঠশালা।
পুস্তক মেলায় কাজ করা এক পুরনো গবেষক জানালেন,
— রংপুর অঞ্চলের এক প্রত্যন্ত গ্রামে আগে এমন একটি পাঠশালা ছিল, এখন আর পাঠশালা নেই, কেবল ভগ্ন ভবন আর কিছু গুঞ্জন রয়ে গেছে।
আরিব ট্রেন ধরে চলে গেল সেইদিকে।
পথে পথেই ডায়েরি পড়ে। মীরার লেখা যত পড়ে, ততই যেন তার নিজের ভেতরের কোনো সত্তা খণ্ড খণ্ড হয়ে জোড়া লাগতে শুরু করে।
বিকেলবেলা পৌঁছায় সে।
একসময়কার প্রাথমিক বিদ্যালয়, এখন জঙ্গলবেষ্টিত ইটের দেয়াল।
চারা গাছের ফাঁকে ফাঁকে চুন উঠে যাওয়া লেখা—
কৃষ্ণতারা বালিকা বিদ্যালয়।
মনে হয়, যেন কেউ নামটা স্বপ্ন থেকে তুলে এনেছে।
আরিব ভেতরে ঢোকে।
একটা ছোট ঘর—ভাঙা খাট, এক কোণে বৃষ্টির ছাপ, এবং একটা পুরনো আলমারি।
আলমারির ভেতর কেবল ধুলো আর পুরনো কাগজ।
তার ভেতরেই থাকে এক মোটা খাতা—জং ধরা পিনে বাঁধা।
মোড়কে লেখা:
“মীরার কাব্যসংহিতা”
(যদি কখনো আবার কেউ ফিরে আসে, তবে এই পাণ্ডুলিপি তাকেই নিবেদন)
আরিব স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
সে বসে পড়ে মেঝেতে, মোমবাতি জ্বালে, আর পড়তে থাকে…
পাণ্ডুলিপির অংশ (প্রথম পৃষ্ঠা):
“তোমায় আমি ফিরে পেতে চেয়েছি সমস্ত জন্মের বিনিময়ে। যদি শব্দ হয় আশ্রয়,
যদি কবিতা হয় পুনর্জন্মের দেহ—
তবে এ আমার কবরনামা নয়, ভালোবাসা-নামা।
তুমি যেখানেই থাকো, আমি জানি, তুমি একদিন পাঠ করবে একে।
আর তখনই আমি আবার বেঁচে উঠব—তোমার হৃদয়ে।”
আরিবের চোখে জল আসে। সে বুঝতে পারে, এই পাণ্ডুলিপি শুধু কবিতা নয়—
এ তার জন্য লেখা একমাত্রিক, অথচ বহুজন্মিক প্রেমের দলিল।
হঠাৎ এক কণ্ঠ...
ঠিক তখনই, বাইরে থেকে এক নারীকণ্ঠ ভেসে আসে—
— “তুমি কি ওটা পেয়েছো? ওটা কি তোমার?”
আরিব ছুটে বেরোয়।
দেখে, একটা নারীছায়া মাঠের ওপারে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে প্রদীপ, চোখে ছায়া, মুখে অদ্ভুত শান্তি, গালে সেই চিরচেনা তিল।
— তুমি কে?
— আমি এই ঘরের সাক্ষী। আমি কেবল ছায়া। কিন্তু তুমি যদি সত্যিকারের সে হও, তবে সময় এবার নিজেই পথ খুলবে।
ছায়াটি মিলিয়ে যায়।
আরিব বোঝে—এই পথ শেষ নয়। এরপরেও রয়েছে এক চূড়ান্ত মিলন—হয়তো কোথাও, হয়তো তার নিজের ভেতরেই।
( চলবে...)







































