
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিচারকাজের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। বিচারক-শূন্যতায় গত ১৩ জুন থেকে বিচারকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়। এরপর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন হলে প্রসিকিউশন টিমের সব আইনজীবী পদত্যাগ করেন।
পদত্যাগ ও বদলির কারণে তদন্ত সংস্থায়ও কর্মকর্তাশূন্য হয়। এরই মাঝে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটর ও আরও চার আইনজীবী প্রসিকিউটর নিয়োগ দিয়ে প্রসিকিউশন টিম পুনর্গঠন করা হয়। সর্বশেষ গত বুধবার তদন্ত সংস্থায় ১০ কর্মকর্তা নিয়োগ দেয় সরকার।
গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ২৮টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। সেসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। অভিযোগের সূত্র ধরে আলামত ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রসিকিউশন অভিযোগসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও ট্রাইব্যুনালে বিচারক-শূন্যতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ‘দ্রুততম সময়ে বিচারক নিয়োগ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি। আশা করছি, শিগগিরই বিচারক নিয়োগ দেওয়া হবে। বিচারকাজ শুরু হলেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হবে।’
তিনি জানান, টাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টরা চাইলে বিদেশি আইনজীবীও রাখতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন টিম কোনো আপত্তি করবে না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রসিকিউশন টিম যা যা করা দরকার, সেটা করবে। প্রসিকিউশন টিম অভিযোগের সূত্র ধরে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। তথ্য চেয়ে হাসপাতাল পরিচালকদের কাছেও চিঠি পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক, গণমাধ্যম, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা ছবি-ভিডিও চাওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করা হবে, যাতে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন না থাকে। আলামত তাজা থাকতেই বিচার প্রক্রিয়া শুরুর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত বিচার শুরুর প্রত্যাশা করছেন। সাক্ষীরাও আগ্রহী। এখন ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হলেই বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৪ বছর বিচারকাজ সচল থাকার পর ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্যের একজন অবসরে, আরেকজনকে হাইকোর্টে ফিরিয়ে নেওয়া এবং অপর বিচারক ছুটিতে যাওয়ায় গত ১৩ জুন বিচারকাজ বন্ধ হয়। তখন ট্রাইব্যুনালে ৩০টি মামলা বিচারাধীন ছিল। তবে এবার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধেরও বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তদন্ত সংস্থায় প্রথম অভিযোগটি দায়ের হয় গত ১৪ আগস্ট। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও পুলিশের সাবেক কর্মকর্তাসহ মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এরপর শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থায় মোট ২৮টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে ২০১৩ সালে মতিঝিলে হেফাজতের কর্মসূচিতে পুলিশি হামলার ঘটনায়। বাকিগুলো গত ৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের ঘটনা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালের ২৫ মার্চ। সে সময় মামলার তদন্ত ও বিচারকাজে ব্যাপক তৎপরতা দেখা যায়। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনাও তৈরি হয়। বিচারকাজ ত্বরান্বিত করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুটিকে একীভূত করে আবার একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়। এ সময়ের মধ্যে অনেক আলোচিত মামলার রায় এবং রায় কার্যকর করা হয়। গত ১৪ বছরে ৫৫টি মামলার রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এসব মামলায় ১৪৯ জনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ছয়জনের। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা পাঁচজন এবং একজন বিএনপির নেতা। বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম এই ট্রাইব্যুনালেই ২০১০ থেকে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের পক্ষে অন্যতম আইনজীবী ছিলেন। শুনানির সময় তাদের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। শুনানির বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে কয়েকবার আদালত অবমাননার অভিযোগ আনলেও তা প্রমাণ করতে পারেননি।
এদিকে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজে স্থবিরতা তৈরি হয় গত বছরেই। সর্বশেষ চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি শেরপুরের নকলার তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সেই সময়ে ট্রাইব্যুনালে ৩০ মামলার বিচার চলছিল। এরপর দু-একটি মামলার শুনানি হলেও কোনো রায় হয়নি।







































