
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে কোনো সাড়া-শব্দ লক্ষ করা যাচ্ছে না। নিজেদের দলীয় অবস্থান থেকেও বর্তমানে শরিক দলগুলোর কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ছে না।
সূত্র বলছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটগত মনোনয়ন নিয়ে শুরু হয় হতাশা। শেষে ৭ আসনে সমঝোতা হলেও শরিক দলগুলোর হতাশা কাটেনি। ৭ আসনের মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে (জাসদ) ৩টি আসন, যার মধ্যে হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২, মোশাররফ হোসেন লক্ষ্মীপুর-৪ এবং রেজাউল করিম তানসেনকে বগুড়া-৪ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিকে ৩টি আসনের মধ্যে রাশেদ খান মেননকে বরিশাল-২, ফজলে হোসেন বাদশাকে রাজশাহী-২ এবং মুস্তফা লুৎফুল্লাহকে সাতক্ষীরা-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এর বাইরে জাতীয় পার্টিকে (জেপি) ১টি আসন পিরোজপুর-২-এ আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এই ৭টি আসনের মধ্যে জয়ী হয়েছেন দুজন প্রার্থী, রাশেদ খান মেনন ও রেজাউল করিম তানসেন।
২০০৮ সালের পর এবারই ১৪ দলের শরিকরা সবচেয়ে কম আসন পেয়েছেন। কারণ মনোনয়ন দেওয়ার পরও আওয়ামী লীগ স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ায় ৭টির মধ্যে ৫ আসনে ১৪ দলের শরিকরা হেরেছেন। এতে জোট শরিক নেতাদের মধ্যে হতাশা আরও বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে শরিকরা আশা করেছিলেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় হয়তো শরিকদের কাউকে মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী করা হবে। তবে দুই দফায় নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন করা হলেও শরিক দলের কোনো নেতাকে মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী করা হয়নি।
সবশেষে সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি মনোনয়ন পেতেও চেষ্টা চালায় জোট শরিক দলগুলো। তাতেও কোনো লাভ হয়নি। পরে অবশ্য গণতন্ত্রী পার্টির কানন আরা বেগমকে সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি করা হয়েছে।
আবার নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে শরিক দলগুলোর নেতারা আশা করলেও জোটনেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। জোটের নেতারা প্রত্যাশা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শরিক দলগুলোর সঙ্গে একটি বৈঠক করলে তারা কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হতে পারতেন। এতে শরিক দলের নেতাদের মধ্যে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার হতো।
১৪ দলের শরিক একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শরিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস-অসন্তোষ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত ১৪ দলীয় জোট ভেঙেও যেতে পারে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ১৪ দলের শরিকদের কোনো কর্মসূচিতেও রাখছে না আওয়ামী লীগ। আবার এমন ঘটনাও ঘটছে, ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমুকে শরিক দলের কোনো নেতা ফোন করলে তিনি রিসিভ করছেন না। কালে-ভদ্রে ফোন রিসিভ করলে জানান, জোটনেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে বসবেন।
তারা আরও বলছেন, ১৪ দলের শরিকদের এভাবে দূরে সরিয়ে রেখে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। কারণ ঘাপটি মেরে থাকা বিএনপি-জামায়াত যেকোনো সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। আওয়ামী লীগকে স্মরণে রাখতে হবে, ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর একটি শক্ত অবস্থান আছে। দলীয় জোট ভেঙে গেলেও দলগুলো কিন্তু থাকবে। আওয়ামী লীগ বর্তমানে যেভাবে একলা চলার নীতি নিয়েছে, তাতে এমন ইঙ্গিত-ই পাওয়া যাচ্ছে-তারা আর শরিকদের চাইছে না।
আবার আওয়ামী লীগের এমন মনোভাবের কারণও রয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে সহযোগিতা পাওয়ার পরও ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। আবার নির্বাচন-পরবর্তী আওয়ামী লীগ বর্তমানে খুবই শক্তিশালী। ফলে ১৪ দলের শরিকদের অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তো আছেই। তবে আমরা আশা করছি শিগগিরই জোটনেত্রী শেখ হাসিনা এবং ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমুর সঙ্গে আমাদের বৈঠক হবে। আর ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে ১৪ দল আছে, থাকবে।’
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বড় দল, ১৪ দলের নিয়ামক শক্তি। তারা এখন কী করে সেটা দেখছি। আর জোটনেত্রী শেখ হাসিনা বলে দিলেই পারেন, তিনি আর ১৪ দলীয় জোট রাখবেন না। দীর্ঘদিন আমরা লড়াই সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত এসেছি। তারা না রাখলে ছোট দল-ছোট হিসেবেই থাকব। এর একটা বিহিত হওয়া উচিত।’
বাসদ আহ্বায়ক রেজাউর রশিদ খান বলেন, ‘রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। হতাশা থাকতেই পারে। এবার আমরা জোটের মনোনয়ন পাইনি। তার মানে আমার দল নেই, তা তো নয়। সময়ই বলে দেবে কী হবে। আশা করছি জোটনেত্রী শেখ হাসিনা ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে বসবেন। তার সঙ্গে বসার পর বোঝা যাবে আসলে আওয়ামী লীগ শরিকদের নিয়ে কী ভাবছে।’
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য এবং ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু বলেন, ‘জোটনেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ দলের শরিক নেতাদের সঙ্গে যে কোনো সময় বসবেন। আমরা সময় চেয়েছি। শিগগিরই নেত্রী সময় দেবেন।’







































