
এক যুগ আগে ঢাকার গুলশানে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কীকে গুলি করে হত্যার মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালেও গতি পাচ্ছে না।
মামলাটি অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আগে তিন বছরের বেশি সময়ে চারজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। আর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তিন বছরে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনজন।
দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল-২ এর পেশকার মো. শাহীন আলম বলেন, সাক্ষী না আসায় এ মামলার বিচার শেষ করতে সময় লাগছে। আগামী ১২ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী তারিখ রয়েছে।
শাহীন বলেন, ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর ৫০ জন সাক্ষীর নামে আদালত সমন জারি করেছে, যাতে তারা এসে সাক্ষ্য দেন।
২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে এ মামলায় বিচার শুরুর আদেশ দেয় ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত।
৭৫ জন সাক্ষীর এই মামলা সাক্ষ্যগ্রহণের মাঝপথে ২০২২ সালের ২১ মার্চ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এ বদলির আদেশ দেয় আইন মন্ত্রণালয়।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “অভিযোগকারী আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন না। বাদী যোগাযোগ করলে আমরা সাক্ষী হাজির করার চেষ্টা করি। বাদী এলে সুবিধা হয়।”
অ্যাডভোকেট ফারুকী বলেন, তারা সাক্ষীদের হাজির করার চেষ্টা করছেন। সমন দেওয়া হচ্ছে সাক্ষী আসার জন্য।
মামলার বাদী মিল্কীর ছোট ভাই রাশেদুল হক খানের মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে একজন ফোন ধরেন। তবে তিনি রাশেদুল হক খান নন বলে দাবি করেন। পরিচয় জানতে চাইলে, বলতে চাননি সে ব্যক্তি।
মিল্কী ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রাতে গুলশানে শপার্স ওয়ার্ল্ড নামে একটি বিপণী বিতানের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পরদিন তার ছোট ভাই বাদী হয়ে গুলশান থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে, অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল র্যাব-১ এর সহকারী পরিচালক কাজেমুর রশিদ ঢাকা মহানগর হাকিম তারেক মঈনুল ইসলাম ভূঁইয়ার আদালতে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন।
এরপর বাদীর আপত্তিতে তদন্তের দায়িত্ব পান পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সহকারী সুপার উত্তম কুমার বিশ্বাস। তিনি ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
আগের অভিযোগপত্রের ১১ আসামির সঙ্গে আরও সাতজনকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আর নয়জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
২০১৬ সালের ১৪ মে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত মামলার অভিযোগপত্র আমলে নেন। দুই বছর পর অভিযোগ গঠন করা হয়।
আলোচিত এ মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ছিলেন মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু, যাকে গত বছরের ২৪ মার্চ রাতে ঢাকার শাজাহানপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়। তবে মিল্কী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র থেকে আগেই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- মো. সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, ফাহিমা ইসলাম লোপা, শরীফ উদ্দিন চৌধুরী ওরফে পাপ্পু, সৈয়দ মুজতবা আলী ওরফে রুমী, আমিনুল ইসলাম ওরফে হাবিব, সোহেল মাহমুদ ওরফে সোহেল ভূঁইয়া, চুন্নু মিয়া, আরিফ ওরফে আরিফ হোসেন, সাহিদুল ইসলাম, ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ, জাহাঙ্গীর মণ্ডল, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, তুহিন রহমান ফাহিম, মোহাম্মদ রাশেদ মাহমুদ ওরফে আলী হোসেন রাশেদ ওরফে মাহমুদ, সাইদুল ইসলাম ওরফে নুরুজ্জামান, সুজন হাওলাদার, ডা. দেওয়ান মো. ফরিউদ্দৌলা ওরফে পাপ্পু ও মামুন উর রশীদ।
এদের মধ্যে প্রথম চার জন পলাতক। অন্য ১৪ আসামি জামিনে রয়েছে।
বিচারে এমন ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি আবদুল নূর বলেন, “আমি কয়েকদিন আগে নিয়োগ পেয়েছি। এ মামলাটি সম্পর্কে এখনো জানি না। মামলার নথি দেখে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য চেষ্টা করব।”
আসামি আমিনুল ইসলাম, সোহেল মাহমুদ, শহিদুল ইসলাম, চুন্নু, আরিফ ও খলিলের আইনজীবী সিরাজুল হক ফয়সাল বলেন, এ মামলায় সাক্ষী আসে না। প্রায় দেড়বছর আগে সাক্ষী এসেছিল, এরপর আর সাক্ষী আসে না।
তিনি বলেন, মামলার ঘটনা প্রায় ১২ বছর হয়ে গেছে। সাক্ষ্য হয়েছে মাত্র ৭ জনের। যেভাবে এ মামলা চলছে, এতে বিচার শেষ হতে আরও ১০ থেকে ১২ বছর লেগে যাবে।
সাক্ষী আসে না কেন জানতে চাইলে ফয়সাল বলেন, “সাক্ষী নিয়ে আসার দায়িত্ব বাদী আর রাষ্ট্রপক্ষের। তারা কেন আনতে পারছে না, আমরা বুঝতে পারছি না। যখন সাক্ষী আসে আমরা আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করে সাক্ষ্য শেষ করি।
“আমাদের দিক থেকে কোন গাফিলতি নেই। আমরা চাই দ্রুত সাক্ষ্য শেষ করে মামলার ন্যায়বিচার হোক।”
জাহাঙ্গীর নামের আরেক আসামির আইনজীবী নূর ইসলাম খান বলেন, “মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। সাক্ষীরা ঠিকমত না আসায় মামলাটি ঝুলে আছে। আমরা চাই মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হোক।”







































