
রাজিব সুজন, পটুয়াখালী: সাগরবেষ্টিত উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী লবণাক্ত ও অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণতার মধ্যেও আজ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। লোনা পানির প্রভাব ও জোয়ারের উচ্চতা যেখানে একসময় ধান উৎপাদনের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, সেখানে এখন স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তির মাধ্যমে এই সকল বাধাকেই সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া হচ্ছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর “নতুন ৬ টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন প্রকল্প (এলএসটিডি)” এর অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পটুয়াখালী—যা উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক পথে এগিয়ে নেওয়ার এক নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও প্রযুক্তি হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালের জুন মাসে মাত্র ৬ জন জনবল (১ জন রাজস্বখাতের বিজ্ঞানী ও ৫ জন প্রকল্পকর্মী)—নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পটুয়াখালী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় কৃষির বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। উপকূলীয় পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ধানের জাত ও আধুনিক প্রযুক্তির সফল অভিযোজনের মাধ্যমে স্টেশনটি শুধু উৎপাদন সম্ভাবনাই বাড়ায়নি, বরং মাঠপর্যায়ে গবেষণা ও সরাসরি সহায়তার মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে দ্রুত আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমন মৌসুমে জোয়ার-ভাটা সহনশীল ব্রি ধান৫২ ও ব্রি ধান১০৯, পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ব্রি ধান১০৩-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করে স্টেশনটি ফলন বৃদ্ধি ও শস্য নিবিড়তা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে বোরো মৌসুমে লবণাক্ততা সহনশীল ও উচ্চফলনশীল ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৯৯, ব্রি ধান১০৫ এবং ব্রি ধান১০৮-এর মানসম্মত বীজধান প্রায় ৫০–৫৫ জন কৃষকের মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার কৃষকরা জলবায়ু-উপযোগী জাত চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন এবং টেকসই ধান উৎপাদনের পথে একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে উঠছে। পটুয়াখালী সদর উপজেলার বল্লভপুর ও পশুরীবুনিয়া গ্রামের একাধিক প্রগতিশীল কৃষক—মোঃ আবুল কালাম, সেলিম জোমাদ্দার ও কাউসার জোমাদ্দার—স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান১০৩ এবং ব্রি ধান১০৯-এর বীজ সংরক্ষণে এগিয়ে এসেছেন। ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশনের কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ শুকানো, সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি ও সংরক্ষণাগার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে হাতে-কলমে দিকনির্দেশনা প্রদান করছেন।
পাশাপাশি এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় এলএসটিডি বীজ সংরক্ষণ পাত্র সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ সংরক্ষণ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব বীজ উৎপাদন ও পরবর্তী মৌসুমে তা ব্যবহারের আগ্রহ ও সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধান উৎপাদনে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের বাস্তব সুফল উপকূলীয় কৃষকরা ইতোমধ্যেই হাতেনাতে পাচ্ছেন। পটুয়াখালী সদর উপজেলার প্রযুক্তি গ্রামের কৃষক সেলিম জোমাদ্দার জানান, স্বল্প জীবনকালবিশিষ্ট ব্রি ধান১০৩ চাষের ফলে তিনি সময়মতো জমি খালি করে শীতকালীন সবজি ও সরিষা চাষের বাড়তি সুযোগ পাচ্ছেন, যা তার মোট আয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অন্যদিকে কলাপাড়া উপজেলার কৃষক মোঃ দুলাল মুন্সী বলেন, লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৬৭ চাষের মাধ্যমে তার চাষাবাদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং লোনা পানির ক্ষতি থেকে তিনি অনেকটাই নিরাপদ থাকতে পারছেন। একই উপজেলার আরেক কৃষক মোঃ রুবেল আলম জানান, ব্রি ধান৯৯ লবণাক্ত পরিবেশেও স্থিতিশীল ও ভালো ফলন দেওয়ায় তার জমির উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকছে।
এসব অভিজ্ঞতা উপকূলীয় এলাকায় ব্রি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং কৃষকদের জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্ট। স্টেশনটি ব্রি-এর গবেষণা বিভাগ ও আঞ্চলিক কার্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে বাস্তব ও সময়োপযোগী গবেষণা পরিচালনা করছে।
উল্লেখযোগ্য গবেষণার মধ্যে রয়েছে বায়োচার আবৃত ইউরিয়া—যা ইউরিয়া সারের দক্ষ ব্যবহার বাড়ানো ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে সহায়ক। পাশাপাশি সেচ, সার, রোগবালাই ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, লবণাক্ততা সহনশীলতা, শস্য নিবিড়তা, যান্ত্রিকায়ন এবং জলাবদ্ধতা মোকাবিলার প্রযুক্তি মূল্যায়ন চলমান রয়েছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মাঠদিবস ও প্রযুক্তি পরীক্ষণের মাধ্যমে এসব জ্ঞান কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পটুয়াখালীর অধিক্ষেত্র এলাকার উপযোগী শস্য বিন্যাস নির্বাচন ও কার্যকারিতা মূল্যায়নে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর রাইস ফার্মিং সিস্টেম বিভাগ এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)-এর সরেজমিন উইং ঘনিষ্ঠভাবে কারিগরি ও গবেষণা সহায়তা প্রদান করছে। এর ফলে উপকূলীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লাভজনক ও টেকসই শস্য বিন্যাস নির্ধারণে কার্যক্রম আরও গতিশীল হচ্ছে।পটুয়াখালী সদর উপজেলার পশুরীবুনিয়া প্রযুক্তি গ্রাম ও অন্যান্য উপজেলায় আউশ/পতিত–রোপা আমন –বোরো/ ডাল/তেল ফসল/সবজি এই শস্য বিন্যাসে সফলতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। কৃষকের শ্রম কমাতে ও সময় বাঁচাতে এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে ব্রি আগাছা নিড়ানি যন্ত্র, ব্রি দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, ব্রি সিড সোয়ার, ট্রান্সপ্লান্টার, ব্রি সোলার লাইট ট্র্যাপসহ মোট ৫ টি যন্ত্রের মূল্যায়ন কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আজ পটুয়াখালীর কৃষক শুধুমাত্র সমস্যার সমাধানের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ কৃষি সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা পেতে ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশনকে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখছেন। কৃষি–সংক্রান্ত যেকোনো সহায়তার প্রয়োজন হলে তারা দ্রুত এই স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ও সময়োপযোগী সমাধান পাচ্ছেন। জোয়ার-ভাটা, লবণাক্ততা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো কঠিন জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পটুয়াখালী আজ উপকূলের কৃষকদের নতুন ভরসা। প্রযুক্তি-নির্ভর গবেষণা ও উদ্ভাবনের এই কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে উপকূলীয় কৃষির রূপান্তরের মডেল হয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি অগ্রগতি এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু সহনশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।





























