
১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল এখন অনেকটা ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টানেলে প্রতিদিন যে পরিমাণ গাড়ি চলাচলের প্রত্যাশা ছিল; তার তিন ভাগের এক ভাগও চলাচল করছে না। তাই প্রতিদিন এই টানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় ৩৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় হলেও আয় হচ্ছে মাত্র ১০ লাখ ৩৭ হাজার। অর্থাৎ প্রতি মাসে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এই টানেল পরিচালনায় আট কোটি ১৩ লাখ টাকা খরচ হিসাবে বছরে লোকসান হচ্ছে প্রায় একশ কোটি টাকা।
তবে টানেলের দক্ষিণ প্রান্তে আনোয়ারা অঞ্চলে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের যেই পরিকল্পনা ছিল, তা পুরোদমে বাস্তবায়ন না হওয়ায় টানেল ব্যবহার কম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা। তজ্জন্য টানেলের সংযোগ সড়ক ও পার্শ্ববর্তী এলাকার উন্নয়ন এবং সার্ভিস এরিয়া বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে প্রতিদিন ছোট-বড় মিলে অন্তত ৩০ হাজার যানবাহন চলাচল করে। কর্ণফুলী টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, টানেল চালু হওয়ার পর এক বছরের মাথায় দিনে ১৮ হাজার ৪৮৫টি যানবাহন চলাচল করবে। আর ২০২৫ সালে গড়ে প্রতিদিন ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচল করবে। ২০৩০ সালে যানবাহন চলাচলের প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৯৪৬টি।
সেই হিসাবে বর্তমানে দিনে টানেল হয়ে কী পরিমাণ যানবাহন চলাচল করছে? জানতে চাইলে কর্ণফুলী টানেলের টোল ট্রাফিক বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী গোলাম সামদানী হিমেল বলেন, প্রতিদিন গড়ে চার হাজারের মতো যানবাহন চলাচল করছে। তবে সম্প্রতি ঈদের তিন-চার দিন দিনে ছয় হাজারের মতো গাড়ি চলাচল করেছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার (ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত) এই কর্ণফুলী টানেল উদ্বোধন করেছিলেন। এই টানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় প্রতিদিন ৩৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সেতু বিভাগের সংশ্লিষ্টরা। আর বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন তিন হাজার ৯১০টি গাড়ি চলাচলে আয় (টোল থেকে) হচ্ছে ১০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। সেই হিসাবে সেতু বিভাগের দৈনিক লোকসান হচ্ছে ২৭ লাখ ১০ হাজার টাকা। আর মাসে লোকসান হচ্ছে আট কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং বছরে ৯৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
তবে টানেলের ব্যবহার বাড়াতে বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কর্ণফুলী টানেল সাইট অফিসের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, টানেলে নানা কারণে প্রত্যাশিত পরিমাণ গাড়ি চলাচল করছে না। টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক জোনসহ যে শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার কথা, সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। টানেলের সংযোগ সড়কসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোরও উন্নয়ন হয়নি। তাই চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে যেই গাড়িগুলো চলাচল করছে সেগুলো টানেল হয়ে আসছে না।
সেতু বিভাগ এসব বিষয় এবং টানেলের গাড়ি চলাচল বাড়াতে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে উল্লেখ করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, টানেল হয়ে আনোয়ারা-বরকল-গাছবাড়িয়া অংশের ২১ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন এবং টানেলের সার্ভিস এরিয়াকে বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তখন ক্রমান্বয়ে টানেলে গাড়ি চলাচল বাড়বে। তাছাড়া আনোয়ারার পার্কিবিচে যখন উন্নতমানের রিসোর্ট হবে, তখন টানেল হয়ে গাড়ি চলাচল বাড়বে। আশা করি শিগগিরই এসব উদ্যোগের মাধ্যমে টানেলে গাড়ি চলাচল বেড়ে আয়ও বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।
তবে এই টানেল এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী। তিনি বলেন, টানেল নির্মাণে প্রকৃতভাবে সমীক্ষা করা হয়নি। এই টানেল নির্মাণে যেই ব্যয় হয়েছে সেটা দিয়ে অন্তত ১০টি সেতু নির্মাণ করা যেত। মূলত আমাদের দেশে এসব বড় প্রকল্প নেওয়া হয় লুটপাটের জন্য। এখন প্রতিদিন যে লোকসান হচ্ছে, এসবের দায়ভার কে নেবে? টানেল নির্মাণ করে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। এখন এই টানেলের পরিচালন ব্যয় তুলতে এবং গাড়ি চলাচল বাড়াতে কী করা যায়, তা এক্সপার্টদের সঙ্গে আলোচনার করে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলের মূল দৈর্ঘ্য তিন দশমিক ৩২ কিলোমিটার। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ‘কনস্ট্রাকশন অব মাল্টিলেন রোড টানেল আন্ডার দ্য রিভার কর্ণফুলী’ শীর্ষক টানেল প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। ২০২০ সালের জুনে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্মাণকাজেরই উদ্বোধন হয় ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশ সরকার ও চীনা অর্থায়নে এই টানেল নির্মিত হয়েছে। শুরুতেই আট হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া।
সংযোগ সড়কসহ টানেলটির মোট দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার। পশ্চিম ও পূর্বপ্রান্তে পাঁচ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক এবং আনোয়ারা প্রান্তে ৭২৭ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে। দুই সুড়ঙ্গে দুটি করে মোট চারটি লেন রয়েছে। প্রতিটি সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য দুই দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ১৮ থেকে ৩৬ মিটার গভীরে প্রতিটি সুড়ঙ্গ ৩৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট উচ্চতায় নির্মিত।





























