
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় মৌসুমী আমন ধান চারা বিক্রি করে ভাগ্য বদল করেছেন মো: হারুন মিয়া নামে এক কৃষক। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো তিনি ৭ বিঘা জমিতে উচ্চ ফলনশীল জাতের আমন ধানের বীজতলা তৈরি করেন। এখন চলছে পুরোদমে চারা বিক্রি।
স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এসে আমন চারা ক্রয় করছেন। সম্প্রতি বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমন চারার কদর বেড়ে যাওয়ায় তিনি বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গত দুই সপ্তাহের উপর চলছে চারা বিক্রি। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়েছে। জমিতে যে পরিমাণ চারা রয়েছে আরো ২ লাখ টাকার চারা বিক্রি হবে বলে তিনি আশা করছেন।
এলাকায় চারার ভালো চাহিদা থাকায় ৪-৫ দিনের মধ্যে বিক্রি শেষ হবে। যাবতীয় খরচ বাদে তার সাড়ে ৪ লাখ টাকার উপর আয় হবে বলে আশা করছে। মৌসুমী আমন চারা বিক্রিতে ভালো দাম পাওয়ায় তিনি খুবই খুশি। কৃষক হারুন পৌর শহরের তারাগন এলাকার বাসিন্দা। তার পরিবারে স্ত্রী,৩ ছেলে ৩ মেয়েসহ ৮ জন সদস্য রয়েছে।
হারুন বলেন দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে জমি বর্গা (ইজারা) নিয়ে মৌসুমী আমন চারা বিক্রি করছি। এ আমন মৌসুমে ৭ বিঘা জমি (বর্গা) ইজারা নিয়ে উচ্চফলনশীল জাতের ৩০ মণ ধানের বীজতলা তৈরী করি। প্রতি বিঘা জমিতে জমা দিতে হয়েছে ১২ হাজার টাকা। প্রতি ১বিঘা জমিতে বীজ ধান দেওয়া হয় ৪ মণ। হালচাষ, জমা, (ইজারা) বীজ ধানসহ মোট প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ৭ বিঘা জমিতে বীজতলা তৈরিতে আমার খরচ হয়েছে প্রায় ২ লাখ টাকা।
স্থানীয় কৃষকদের কাছে প্রতি ১ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করতে ১৬ শ থেকে ১৮ শ টাকা চারা বিক্রি করছি। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা চারা বিক্রি হয়। জমিতে যে পরিমাণ চারা রয়েছে আরো ২ লাখ টাকা বিক্রি হবে। যাবতীয় খরচ বাদে সাড়ে ৪ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন। প্রতিদিন স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে কৃষকরা যোগাযোগ করে আমন চারা ক্রয় করছেন। তাছাড়া সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় অনেকে এখান থেকে ক্রয় করে অন্য স্থানে বিক্রি করেছেন। সময়মতো বীজতলা তৈরী ও বিক্রি হওয়ায় ভালো দাম পাচ্ছেন বলে জানান।
কৃষক হারুন বলেন, আজ থেকে প্রায় ১৭ বছর আগে মাত্র ৭ শতাংশ জায়গাতে পরীক্ষামূলক বীজতলা তৈরি করে যাত্রা শুরু করি। প্রথম বছর চারা বিক্রিতে ভালো সারা পাওয়া যায়। এরপর আমার উৎসাহ বেড়ে যায়। এ মৌসুমে ৭ বিঘা জমিতে আমন চারা তৈরি করি।
তিনি আরো বলেন, ধান বীজ পানিতে ভিজিয়ে প্রস্তুত, জমি তৈরিসহ আবাদ উপযোগী হতে ১ মাস সময় লাগে। এখন চলছে চারা বিক্রি।
তিনি আরো বলেন, কম শ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় প্রতি বছর বাড়ছে বীজতলা তৈরির জমির পরিমাণ। বীজতলা বা চারা ভালো রাখতে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শ নিচ্ছি। বাড়ির জায়গা ছাড়া কৃষিকাজ করার অন্য কোনো জায়গা নেই। জমি বর্গা বা ইজারা নিয়ে মৌসুমী ধান চারা বিক্রি, কৃষি কাজ আর ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রিতে চলে আমার সংসার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আমন মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিচু জমিতে পানি থাকায় অনেক কৃষকরা আমন বীজতলা তৈরি করতে পারেন না। আবার অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে অনেক কৃষকের আমন বীজতলা নষ্ট হওয়ায় তাদের চারা কেনার ওপর নির্ভর করতে হয় । ফলে এ মৌসুমে স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকদের কাছে আমন চারার কদর থাকে বেশি। তাই অনেক কৃষকর তার কাছ থেকে আমন চারা ক্রয় করে জমি আবাদ করেন।
উপজেলার ধরখার এলাকার কৃষক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, বন্যার কারণে আমার বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই জমি আবাদ করতে তারাগন এলাকার কৃষক হারুন মিয়ার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করা হয়। প্রতি ১ বিঘা জমির চারা ১৭ শ টাকায় ক্রয় করা হয়। গত আমন মৌসুমে যে চারা ১৪ শ টাকায় ক্রয় করেছি এবার ৩ শ টাকা বেশি দিয়ে ক্রয় করতে হয়েছে। গত বোরো মৌসুমে ধানের ফলন ও বিক্রিতে ভালো দর পাওয়ায় বেশ লাভবান হয়েছি। তাই এ মৌসুমে ৫ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করা হবে।
কৃষক আব্দুল আওয়াল মিয়া বলেন, আমাদের এলাকা নিচু হওয়ায় ইচ্ছে করলেও বীজতলা তৈরি করা যায় না। তাই প্রতি বছর চারা ক্রয় করে আমন আবাদ করতে হয়। গত ৪ বছর ধরে কৃষক হারুন মিয়ার কাছ থেকে আমন চারা ক্রয় করে জমি আবাদ করছি। এবারো ৫ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করা হবে। এরইমধ্যে জমি প্রস্তুত শেষ হয়েছে। তাই চারা ক্রয় করতে আসা।
তিনি আরো বলেন, হারুনের আমন চারার মান খুবই ভালো। জমিতে ফলন ভালো হয়।
মোগড়া এলাকার কৃষক মো. আলম মিয়া বলেন, এ মৌসুমে ৫ বিঘা জমিতে আমন আবাদ করি। চারা রোপণের এক সপ্তাহ পরে বন্যায় পুরো আবাদকৃত জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুনরায় জমি আবাদ করতে কৃষক হারুনের কাছ থেকে চারা ক্রয় করতে হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাসসুম বলেন, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় আমন ধান আবাদ প্রায় শেষ পর্যায় চলে এসেছে। কৃষকরা উচ্চফলনশীল নানা জাতের ধান চারায় জমি আবাদ করছেন। কৃষক হারুন আমন বীজতলা তৈরি করে জমি আবাদে কৃষকের ভালো সহযোগিতা করছেন। তার চারার মান খুবই ভালো হওয়ায় কৃষকরা তার কাছ থেকে ক্রয় করে জমি আবাদ করেন।
তিনি আরো বলেন, শেষ পর্যন্ত যদি আবহাওয়া অনকূলে থাকলে আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটে তাহলে আমনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।





























