
সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার (এসবিএসি) ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রায় ৯৪০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ব্যাংকটিতে দাপটের সঙ্গে রয়েছেন মো. মোখলেছুর রহমান। এরপরও রাষ্ট্রীয় তিন সংস্থা দুর্নীতি দমন কমশিন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে গঠিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) কেউই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি মো. মোখলেছুর রহমানের দুর্নীতি বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় তিন সংস্থার কাছে পৃথকভাবে লিখিত অভিযোগ করা হয়। অভিযোগে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. মোখলেছুর রহমান, তার স্ত্রী কামরুন নাহার, ছেলে মুশফিকুর রহমান, মেয়ে মায়িশা মালিহার নাম রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে ছেলে মুশফিকুর রহমান, মেয়ে মায়িশা মালিহা বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে।
ছেলে-মেয়েদের নামে মানিলন্ডারিং ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং কর ফাঁকির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। মো. মোখলেছুর রহমানসহ তার স্ত্রীও ছেলে-মেয়েদের নামে ছয়টি ব্যাংকের ৯৩৯ কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে। যা তিনি তার টেক্স ফাইলে দেখাননি। এর মধ্যে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংকের ২২০ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংকের ২১৬ কোটি টাকা, শাহজালাল ব্যাংকের ১৮৫ কোটি টাকা, ইউসিবিতে ৫৪ ও স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ৬৪ কোটি টাকা এফডিআর রয়েছে।
বিএন্ডটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মোখলেছুর রহমান ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের যশোর-৩ আসনের সাবেক এমপি কাজী নাবিল আহমেদের ঘনিষ্টজন ছিলেন। তিনি ১৯৯৬-২০০৬ সাল পর্যন্ত জেমকন গ্রুপের বেতনভুক্ত পরিচালক (টেকনিক্যাল) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
জানা গেছে, সাবেক এমপি নাবিলের পরামর্শে তার বাবা পিতা কাজী শাহেদ আহমদ মো. মোখলেছুর রহমানের নামে একটি পোল ফ্যাক্টরি লিখে দেন। যাতে নাবিলের অবৈধ টাকা তার বিশ্বস্ত মোখলেছুর রহমানের কাছে রাখতে পারেন। তিনি নাবিলের অবৈধ সম্পদ রক্ষায় গ্রুপ অফ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। যাহাতে এমপি তার অবৈধ টাকা বিনিয়োগ করেন। ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নাবিল আহমেদের বিপুল অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচারের সুযোগ করে দেন মোখলেছুর।
অভিযো পাওয়া গেছে, নাবিল আহমেদের অবৈধ অর্থ রক্ষার্থে মোখলেছুর নিজের নামে, তার স্ত্রীর নামে ও তার সন্তানদের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। মোখলেছুর রহমান নাবিল আহমেদের অবৈধ অর্থ দিয়ে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকের দুটি শেয়ার কেনেন। শেয়ার দুটির আনুমানিক বাজার মূল্য ২০০ কোটি টাকা প্রায়। বর্তমানে তিনি অবৈধ টাকার মাধ্যমে বিএনপির বিভিন্ন মহলের নাম ভাঙিয়ে ও নিজ প্রভাব খাটিয়ে গত বছরের ৫ আগস্টের পর ৩০ সেপ্টেম্বর সুকৌশলে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন। বর্তমানে তার ছেলেও একই ব্যাংকের ডাইরেক্টর। বর্তমানে তিনি উক্ত ব্যাংকের কোনো নিয়ম কানুন না মেনেই সকল কর্মকর্তার কাজে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করেন। বর্তমানে তিনি এনআরবিসি ব্যাংকের অতিরিক্ত ম্যানেজিং ডাইরেক্টর রবিউলকে তার ব্যাংকে আনার জন্য অফার লেটার দিয়েছেন। বর্তমানে এই অতিরিক্ত ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের (এএমডি) নামে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা চলমান আছে।
এছাড়াও তিনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে নাজিমুদ্দৌলাকে এই ব্যাংকের নতুন ডিএমডি হিসেবে নিয়োগ দেন। যার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরুপে অবৈধ। এমনকি তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন গাইড লাইনও অনুসরণ করেননি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অনুমতিও নেননি। এছাড়াও ইতোমধ্যে তার অনেক আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অত্র ব্যাংকে নিয়োগ দিয়েছেন। এতেই বুঝা যাচ্ছে যে, তাদের আনার মাধ্যমে এই ব্যাংকের বিরাট অংকের অর্থ লোপাট করার চিন্তা করছেন।
এছাড়াও, বিএন্ডটি কোল্ডে স্টোরেজ লিমিটেড, বিএন্ডটি ডেভোলাপমেন্ট লিমিটেড, বিএন্ডটি মিটার লিমিডেট, বিএন্ডটি ট্রান্সফরমার্স লিমিটেড অত্র কোম্পানির মাধ্যমে খাদ্য অধিদপ্তরে এবং বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন টেন্ডার বাণিজ্য করে বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন। বর্তমানে তার নিকট প্রচুর পরিমাণ অবৈধ অর্থ থাকার অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে বিএন্ডটি কোল্ডে স্টোরেজ লিমিটেড-এর মাধ্যমে প্রতিবছর আলুর অবৈধভাবে মজুদ, আমদানি করে দেশের বাজারমূল্য ঊর্ধ্বমুখী করেন। যার ফলে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে নষ্ট হচ্ছে। তিনি বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেন। বর্তমানে তার নিজ নামে চুয়াডাঙ্গায় একটি বিশাল বাগানবাড়ি রয়েছে। এই এলাকাতে তার নামে অনেক জায়গা জমি রয়েছে। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ১৫০ কোটি টাকা প্রায়।
এছাড়াও তার নিজ নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই-ব্লকে ১০ বিঘা জায়গা রয়েছে। যাহার আনুমানিক বাজার মূল্য ৩০০ কোটি টাকা প্রায়। এছাড়াও বসুন্ধরা আবাসিকে তার মেয়ে, ছেলে ও স্ত্রীর নামে আরও ৬ বিঘা জায়গা রয়েছে। যাহার বর্তমান বাজার মূল্য ১৭০ কোটি টাকা প্রায়। তেজগাঁও লিংক রোডে শান্তা- ওয়েস্টার্ন টাওয়ারে মোখলেছুর রহমানের নামে ৬টি ফ্লোর রয়েছে। যাহার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২৮০ কোটি টাকা। এছাড়াও তার নামে বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের বি ব্লকের ৮০ নম্বর প্লটে ১৫তলা বিশিষ্ট বিশাল বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়াও তার ছয়টি ব্যাংকে ৯৩৯ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। এর মধ্যে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকে ৩০০ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকের বনানী ১১ নম্বর ব্রাঞ্চে ২২৮ কোটি টাকা ও তেজগাঁও লিংক রোড ব্র্যাঞ্চে ৭২ কোটি টাকার এফডিআর আছে ও এনসিসি ব্যাংকে ২২০ কোটি টাকার এফডিআর আছে এবং সাউথইস্ট ব্যাংকে ২১৬ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। শাহজালাল ব্যাংকে ১৮৫ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে ও ইউসিবিএল ব্যাংকে ৫৪ কোটি টাকা এফডিআর রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ৬৪ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে।
বর্তমানে মোখলেছুর রহমানের তার স্ত্রীর নামে বনানীতে একটি বিশাল বাড়ি কিনেছেন। যাহার ঠিকানা : হাউজ-৭৮, রোড নং-২, ওয়ার্ড নং-১৯, বনানী, ঢাকা-১২১৩। এটার আনুমানিক বাজার মূল্য ১৫০ কোটি টাকা প্রায়। এছাড়াও অবৈধ টাকার মাধ্যমে তার ছেলে ও মেয়ের নামে গুলশানে অনেক কয়েকশ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি কেনার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি মো. মোখলেছুর রহমান তার ছেলে ও মেয়ের নামে গুলশান-২ এ একটি বিশাল বাড়ি ক্রয় করেছেন। যার ঠিকানা: হাউজ-২৫/বি, রোড নং-১০৭, ওয়ার্ড নং-১৯, পোস্ট অফিস- গুলশান, গুলশান-০২, জেলা-ঢাকা-১২১২। এই বাড়ির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে তার নিজের ও পরিবারের নামে-বেনামে অনেক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। অবৈধ অর্থ পাচারের মাধ্যমে কানাডা ও আমেরিকায় তার বেশ কয়েকটি বাড়ি রয়েছে বলেও জানা গেছে।
মোখলেছুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ জমা রয়েছে। মো. মোখলেছুর রহমানের ছেলে ও মেয়ে আমেরিকার গ্রিনকার্ড হোল্ডার।
এর আগে, গত ১৩ মার্চ জেমকন গ্রুপের মালিক যশোর-৩ আসনের সাবেক এমপি কাজী নাবিল আহমেদ, পিতা মৃত কাজী শাহেদ আহমেদ, মা আমিনা আহমেদ, দুই ভাই কাজী আনিস আহমেদ, কাজী ইনাম ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ৩৬টি কোম্পানির ৪ কোটি ২৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮টি শেয়ার ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এসব শেয়ারের অভিহিত মূল্য ৬০ কোটি ৪৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। ফ্রিজ করা শেয়ারের মধ্যে রয়েছে- ক্যাস্টল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকার ১১৮০টি শেয়ার, জেমকন লিমিটেডের ৫০ লাখ টাকার ৫ লাখ শেয়ার, চার্কা এসপিসি পলিশ লিমিটেডের ৪৫ লাখ টাকার ৪ হাজার ৫০০ শেয়ার, কাজী অ্যান্ড কাজী টি স্টেট লিমিটেডের ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ৪৭ হাজার ৫০০ শেয়ার, চার্কা স্টিল লিমিটেডের ২ কোটি টাকার ২০ হাজার শেয়ার, করোতোয়া টি স্টেট লিমিটেডের ১ কোটি টাকার ১০ হাজার শেয়ার, রওশনপুর টি ফ্রন্টিয়ার লিমিটেডের ১ কোটি টাকার ১০ হাজার শেয়ার, জেমকন টি স্টেট লিমিটেডের ১ কোটি টাকার ১০ হাজার শেয়ার, পাথার লিমিটেডের ২ কোটি ৭০ লাখ টাকার ২৭ হাজার শেয়ার, জেমকন ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টস লিমিটেডের ১ কোটি ৯০ লাখ টাকার ১৯ হাজার শেয়ার, জেমকন সিটি লিমিটেডের ১ কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ২৩ হাজার ২৫০টি শেয়ার, জেম জুট লিমিটেডের ২০ কোটি টাকার ২ কোটি শেয়ার, বেঙ্গল হারবাল গার্ডেন লিমিটেডের ২০ লাখ টাকার ২ হাজার শেয়ার, জেমকন সি ফুড লিমিটেডের ২০ লাখ টাকার ২০ হাজার শেয়ার, মিনা সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারি লিমিটেডের ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ১৫ লাখ শেয়ার, মিনা রিটেইলস লিমিটেডের ১ কোটি টাকার ১০ লাখ শেয়ারসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি রয়েছে। দুদকের উপপরিচালক রেজাউল করিম এসব শেয়ার ফ্রিজের আবেদন করেন।







































