
চালক ও জ্বালানির ব্যবস্থা না রেখেই গাড়ি বরাদ্দ!
নাহিদ ইসলাম, রাজশাহী ব্যুরো: রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের মেডিক্যাল সাব-ডিপোর প্রধান ফটকে দাঁড় করিয়ে রাখা রেফ্রিজারেটর ভ্যানটি এখনও বেশ চকচকে। হঠাৎ দেখে যে কারও মনে হতে পারে, ডিউটি শেষে পার্কিং করে রাখা। কিন্তু আসলে ঢাকা থেকে নিয়ে আসার পর এখান থেকে আর বের করাই হয়নি গাড়িটি। এই কাভার্ড ভ্যানটির বডি বেশ চকচকে থাকলেও সামনের অংশে বাসা বেঁধেছে মাকড়সার জাল। নষ্ট হতে বসেছে ব্যাটারিসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ। এই কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গাড়িটির জন্য চালক ও জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। দুই বছর ধরে গাড়ি এখানেই পড়ে আছে। একদিনও কাজে লাগেনি। কেবল রাজশাহীই নয়, বাকি সাত বিভাগের সাতটিসহ মোট ১০টি গাড়ির অবস্থা একই। গাড়িগুলোর একেকটির দাম প্রায় কোটি টাকা।
কাগজপত্রে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআইয়ের লাইন ডাইরেক্টর (এমএনসিঅ্যান্ডএএইচ) ডা. সাইদুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে দেশের আট বিভাগের জন্য একটি করে রেফ্রিজারেট ভ্যান বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই আদেশে বলা হয় ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (আইএফআরসি) অধীনে দাতা সংস্থা থেকে পাওয়া গাড়িগুলো ইপিআই কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ।
এই রেফ্রিজারেটর ভ্যানগুলোর রেস্ট্রিস্ট্রেশন নম্বর হচ্ছে ঢাকা বিভাগের ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪৪০৭, খুলনা বিভাগের ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪৪০৮, চট্টগ্রাম বিভাগে ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪৪০৯, রাজশাহী বিভাগের জন্য মেট্রো-শ-১১-৪৪১০, সিলেট বিভাগের ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪৪১১, বরিশাল বিভাগের ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪৪১২, ময়মনসিংহ বিভাগের ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪৪১৩ এবং রংপুর বিভাগের ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪৪১৪।
ঢাকার পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে অবস্থিত হুন্দাইয়ের ম্যানেজার (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) মাশরুর আহমেদ মেনন জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার তৈরি হুন্দাই ব্রান্ডের আটটি নতুন রেফ্রিজারেটর ভ্যান সরাসরি দাতাসংস্থাই কিনেছিল। এগুলোর একেকটির বাজারমূল্য প্রায় কোটি টাকা। গাড়িগুলো ২০২২ সালে তৈরি।
এদিকে গাড়িগুলো নিজ নিজ বিভাগে পৌছানোর জন্য জ্বালানি ও চালকসহ অন্যান্য যাবতীয় খরচ আইএফআরসির পক্ষে দাতা সংস্থা বহন করে। বরাদ্দপত্রে বলা হয়েছিল, গাড়িগুলো টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করা হবে। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিজস্ব গাড়ি হিসেবেই ব্যবহার হবে। কখনও ফেরত নেওয়া হবে না। মহাখালীর ইপিআই অ্যান্ড সার্ভিল্যান্সের স্টোর ম্যানেজার (ইনচার্জ) আবুল কালাম মিয়া ও স্টোর কিপার মো. শাহজাহানের স্বাক্ষরে গাড়িগুলো ছাড় করা হয়। পরে নিজ নিজ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় গাড়িগুলো বুঝে নেয়।
রাজশাহী বিভাগের জন্য বরাদ্দ রেফ্রিজারেটর ভ্যানটি (ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪৪১০) ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ বুঝে নেন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আনোয়ারুল কবীর। এ কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী নাসরিন পারভীন বলেন, ‘ঢাকার ড্রাইভারই চালিয়ে নিয়ে এসে গাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছেন। আমাদের ড্রাইভার শুধু একবার চালিয়ে দেখে নিয়েছেন। তারপর থেকেই পড়ে আছে। ব্যাটারি ও ইঞ্জিন ঠিক রাখার জন্য মাঝেমধ্যে স্টার্ট দেওয়া হতো। এখন তাও হয় না। এত দামি একটি গাড়ি অথচ চালানোর কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে আমাদের করারও কিছু নাই।’
বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের অফিস সুপার আবদুল মালেক বলেন, ‘গাড়িটা কেন দিয়েছে, তা বলতে পারছি না। ঢাকা থেকে দিয়েছে; কিন্তু কী কাজের জন্য দিয়েছে, সেটাও বলতে পারছি না। এর জন্য কোনো ড্রাইভারও নাই।’ তবে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের একজন গাড়িচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে মাঝে মধ্যে স্টার্ট দিয়ে একটু এদিক-ওদিক ঘোরানো হতো। এখন আর তাও হয় না। পড়ে থেকে থেকে ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। রংপুরের গাড়িটির অবস্থা আরও খারাপ বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের চাহিদাপত্র বা বাস্তব প্রয়োজন ছাড়াই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই থেকে এনে গাড়ির চাবি ও কাগজপত্র হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কেউ খোঁজ রাখেনি। ফলে বিদেশি অনুদানে পাওয়া কোটি কোটি টাকার গাড়িগুলো পড়ে থেকেই নষ্ট হচ্ছে। গাড়ি পাওয়ার পর গত দুই বছরে একদিনের জন্যও কোনো কাজে লাগানো হয়নি। এসব গাড়ির জন্য চালক ও জ্বালানি বরাদ্দ নেই।
একইভাবে অপর সাত বিভাগেও এই রেফ্রিজারেটর ভ্যানগুলো পড়ে আছে বলে জানান রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. জাফরুল হোসেন। তিনি বলেন, এগুলো বরাদ্দের পর ব্যবহারের জন্য নির্দেশনা নেই। ফলে আমরা কোনো কাজে লাগাতে পারিনি। আসার পর থেকেই রাখা আছে।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, ‘বিভাগীয় পর্যায়ে এ গাড়ির প্রয়োজন নেই। আমরা এগুলো চাইওনি। কিন্তু করোনার সময় আমাদের কাছে ইপিআই থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের এ গাড়ি রাখারও জায়গা নেই। গাড়িটি আমরা ব্যবহার করতেও পারছি না।’ রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকে কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. মেশকাতুল আবেদ বলেন, ‘যারা গাড়ি দিয়েছে তারা মেনটেইনেন্সের জন্য কিছু দেয়নি। এ কারণে আমরা গাড়ি চালাতে পারিনি। পড়ে থেকে থেকে গাড়ির অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে ইপিআইয়ের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান বলেন, আসলেই বরাদ্দ না থাকায় গাড়িগুলো চালু হয়নি। তবে বরাদ্দ না থাকার কারণ ভালো বলতে পারবেন লাইন ডাইরেক্টর এসএম আবদুল্লাহ আল মুরাদ।
যোগাযোগ করা হলে ডা. এসএম আবদুল্লাহ আল মুরাদ বলেন, ‘রেড ক্রস এবং রেড ক্রিসেন্ট এ ধরনের ১৮টি গাড়ি দিয়েছিল। তবে ইপিআইয়ের আওতায় আছে ১০টি গাড়ি। করোনার সময় পাওয়া যায় গাড়িগুলো। ঢাকায় আমাদের গাড়িগুলো রাখার জায়গা নেই। তাই বিভাগগুলোতে পাঠানো হয়েছিল। সামনে অপারেশনাল প্ল্যান্ট চালু হলে গাড়িগুলো কাজে লাগবে। তখন জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়া হবে।





























