
প্রতিবছরই রমজান মাস এলে বেশ কিছু পণ্যের মূল্য আগেভাগেই অনেক বেড়ে যায়। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। রোজায় অন্যতম দুটি ভোগ্যপণ্য ছোলা ও খেজুর। এবার এ দুটি পণ্যের দাম এর মধ্যেই মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। রাজধানীর বাজারে প্রতিকেজি ছোলা এখন ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত বছরের রমজানেও কমবেশি ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর ২৫০ টাকা কেজির খেজুর এর মধ্যেই হয়ে গেছে ৪৫০ টাকা। গত রোজায় যা ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এমনিতেই ভীষণ চাপে আছে মানুষ। রমজান মাসে আবশ্যকীয় নিত্যপণ্যের মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিতে পবিত্র এই মাসে সেই চাপ আরও অনেক বেড়ে যাবে।
এবার রোজার অনেক আগে থেকেই পণ্য দুটির বাজার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নানা কারণ দেখালেও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যৌক্তিক কারণে দাম যতটা বাড়ে, ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ তারচেয়েও অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়। অনেকে আবার অতিরিক্ত মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এতে বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।
রাজধানীর বাজার চিত্র বলছে, আসন্ন রোজাকে ঘিরে অন্যান্য ডালের সঙ্গে ছোলার দামও বেড়েছে। বাজারে এখন প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও ভালো মানের ছোলা এর বেশি দামেও বিক্রি হচ্ছে। আগে যা ৯০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
মালিবাগ বাজারের গাজী স্টোরের মো. রুবেল হোসেনসহ অন্যান্য খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারিতে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরায়ও বাড়াতে হয়েছে। রুবেল বলেন, বর্তমানে পাইকারিতে কালো ছোলা (তুলনামূলক নিম্নমানের) ৯০ টাকা এবং সাদা ছোলা (একটু ভালো মানের) ১০০ টাকা কেজি কেনা পড়ছে। খুচরায় এগুলো বিক্রি করছি যথাক্রমে ১০০ ও ১১০ টাকা কেজিদরে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদন বলছে, রাজধানীর খুচরা বাজারে এখন ছোলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত। গত বছর এ সময় যা বিক্রি হয় ৮৫ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত। গত বছরের চেয়ে ছোলার দাম এবার ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি রয়েছে।
কথা হলে বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শফি মাহমুদ জানান ডলার সংকট ও এলসি জটিলতার কথা। তার দাবি এ দুই কারণে এবার আমদানি ব্যাহত হয়েছে। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, রোজায় বাড়তি চাহিদার কথা মাথায় রেখে এ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইথিওপিয়াসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ থেকে ডালের আমদানি বাড়ায় আমদানিকারকরা। এবার ছোলার আন্তর্জাতিক বাজার অনেকটাই ঠিকঠাক আছে। কিন্তু দেশে ডলার সংকট ও বাড়তি দামের কারণে এলসি খোলা ব্যাহত হয়েছে এবং আমদানিও কমেছে। এতে ছোলাসহ সব ডালের দাম বাড়তি। তারপরও রোজার জন্য বর্তমানে নতুন ছোলার আমদানি আসায় সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু যেগুলো এসেছে তার সিংহভাগই নিম্নমানের। ভালো মানের সংকট থাকায় দাম বাড়তি।
শফি মাহমুদ আরও বলেন, গত রোজার তুলনায় পাইকারিতে ছোলার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে। গতবার প্রতিকেজি আমরা ৬০-৬২ টাকায়ও বিক্রি করতে পেরেছি। এখন ৮২-৮৫ টাকার নিচে বিক্রি করার সুযোগ নেই। আমরা তো আর লোকসান দিয়ে ব্যবসা করব না।
রোজার পণ্য হিসেবে বিবেচিত খেজুরের দামও এবার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পাইকারি বাজারে এখনো দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। আর খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। খুচরায় সাধারণ মানের খেজুরের কেজি ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর রোজায় যা ৩০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে প্যাকেট খেজুরের। গতবারের চেয়ে এসব প্যাকেট দ্বিগুণ-তিনগুণ দামেও বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর মগবাজারের মা ফ্রুটস অ্যান্ড স্টোরের খুচরা বিক্রেতা মো. শাহিদুল ইসলাম বলেন, খেজুর আমদানি হলেও তা এখনো মজুদ করে রাখা হচ্ছে। ফলে দাম বাড়তি। বস্তার খেজুর এখনো সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না। মাত্র সপ্তাহের ব্যবধানে সব প্যাকেট খেজুরের দাম হাজার টাকা বেড়েছে। যত দামি ব্র্যান্ড তত দাম বেড়েছে।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহে পাইকারিতে ৬ কেজির যে কার্টন (১২ প্যাকেট) ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনেছিলাম, গতকাল মঙ্গলবার তা ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কিনতে হয়েছে। সাধারণ মানের মরিয়মের ৫ কেজির প্যাকেট গতকাল মঙ্গলবার ২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। এটা গত সপ্তাহে ১ হাজার ৮০০ টাকা ছিল। গত সপ্তাহে এ খেজুর খুচরায় ৫০০ টাকার আশপাশে বিক্রি করেছি। এখন ৭০০ টাকা বিক্রি করছি। দাম এতটা বাড়ায় বিক্রি নেই। দাম শুনেই সবাই ফিরে যাচ্ছে।
টিসিবির প্রতিবেদনও বলছে, বছরের ব্যবধানে সাধারণ মানের খেজুরের দাম এবার ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি রয়েছে।
এদিকে খোদ পাইকারি ব্যবসায়ীরাই বলছেন, এবার দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। রাজধানীর বাদামতলীর হালিমা ট্রেডার্সের মো. কাননসহ একধিক খেজুরের আমদানিকারক জানান, এবার দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। ডলার সংকটের কারণে এবার ছোট আমদানিকারকরা ব্যাংকে বারবার গিয়েও ফিরে এসেছে। কেবল বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি করতে পেরেছে। ছোটরা তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করছে। এতে এক হাত বেশি বদল হওয়ায় দাম অনেক বাড়তি এবার।
কথা হলে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, খেজুরকে বিলাসী পণ্যের তালিকায় ফেলে শুল্ক অত্যধিক বাড়িয়ে তারপর মাত্র ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে। অপরদিকে কাস্টমসে নিজেদের মতো করে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। ৯০০ থেকে ১০০০ ডলারে আমদানি করা খেজুরে ২৫০০ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হচ্ছে। কাস্টমসের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েও পাইনি। অথচ গত বছর এক কেজি খেজুরে মাত্র ১০ টাকা শুল্ক দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, আমদানি এবার কিছুটা কমলেও চাহিদা মেটানো যাবে। তবে দাম অনেক বাড়তি এবার। গতবার যে খেজুর ১৫০ টাকার আশপাশে বিক্রি করেছি সেটা এবার ৩৫০ টাকাও বিক্রি করতে হতে পারে।
আমদানিকারকরা মজুদ করছেন বলে যে অভিযোগ রয়েছে তা ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, চাহিদা অনেক। হাতে রাখার সুযোগ নেই। বন্দর থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার আমি নিজেই বন্দর থেকে ৭০০ টন খেজুর বিক্রি করেছি। কোথাও মজুদ হচ্ছে না।
রোজার আগেই রোজার পণ্যের বাজারে অস্থিরতায় হতাশা প্রকাশ করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে খেজুরের মতো রোজার অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেখানে কমে সেখানে আমাদের দেশে অত্যধিক বেড়ে যায়। এটা হতাশাজনক। রোজা আসার আগেই বাজারের যে চিত্র তাতে রোজার বাজার নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে সাধারণ ভোক্তারা। সরকার এবার অনেকগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। আশা করব এগুলো কাজে আসবে। রোজায় ব্যবসায়ীরাও নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা করবেন বলে আশা রাখি।







































