
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় হলো গ্রীষ্ম, রমজান ও সেচ মৌসুম। এই সময়ে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা সর্বোচ্চ মাত্রা ছুঁয়ে যায়। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। আগামী মাসে গরম আরও বাড়বে, সে সঙ্গে রমজান ও সেচ মৌসুম শুরু হবে এক সঙ্গে। সে সময় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দেখা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং শুরু হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত বছর গ্রীষ্মকালে জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশ বেগ পেতে হয়। ফলে রাজধানীসহ সারা দেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হয়। এবারও ডলার সংকট চলমান রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, আসন্ন গ্রীষ্মে লোডশেডিং গত বছরের মতো বা তার চেয়েও খারাপ হতে পারে। এ ছাড়া চলতি বছর বৃষ্টি কম এবং গত বছরের চেয়ে গরম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আগামী তিন মাসের আবহাওয়া পরিস্থিতি বিষয়ক আগাম বার্তায় আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, দেশের তাপমাত্রা ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এর বাইরেও দেশে ৩-৫টি মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে সঙ্গে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করার সব রকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত বারের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। আবার চাহিদাও বেড়েছে। প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা বৃদ্ধি পায়। মূল হচ্ছে জ্বালানির যোগান। ডলার সংকট চলছে, তারপরও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির তথ্যানুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে ডে পিক আওয়ারে গড়ে উৎপাদিত হয়েছে ৮ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট আর ইভিনিং পিক আওয়ারে উৎপাদিত হয়েছে ৯ হাজার ৯৩৯ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ উৎপাদিত হয়েছে ৪ ডিসেম্বর ১০ হাজার ৯২১ মেগাওয়াট আর সর্বনিম্ন উৎপাদিত হয়েছে ১৭ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় ৫ হাজার ৬৩৫ মেগাওয়াট। গ্যাস থেকে গড়ে উৎপাদিত হয়েছে ৩ হাজার ৭৮ মেগাওয়াট আর ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত হয়েছে ৭৮ মেগাওয়াট, ফার্নেস ও ডিজেলে ৩৬৬ ও ৮ মেগাওয়াট। নানা কারণে ১৭ হাজার ৭৮৬ মেগাওয়াট উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। এতে দেশের ১৫টি সাব স্টেশন এলাকায় ৬৮০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।
পিডিবির তথ্যানুযায়ী, গত শনিবার সরকারি বন্ধের দিন ইভিনিং পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৭৩২ মেগাওয়াট। গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ৮২৭ মিলিয়ন ঘনফুট। সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস সরবরাহ করতে হবে।
পিজিসিবির তথ্যানুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও লোডশেডিং হচ্ছে। ঘাটতি ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৫৬৮ মেগাওয়াট। জ্বালানি বিভাগ বলছে, চলতি বছর সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা গত বছরের চেয়ে দেড় হাজার মেগাওয়াট বৃদ্ধি পাবে। এ সময় বিদ্যুতের সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। তবে গত বছরের ১৯ এপ্রিল সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট। গত বছর গ্রীষ্মকালে সারা দেশে ব্যাপক লোডশেডিং করতে হয়।
পাওয়ার সেল বলছে, সম্ভাব্য ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে গ্যাসের চাহিদা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৬০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা ন্যূনতম ১ হাজার ৫৪০ মিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে। এ ছাড়াও ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫০ টন এবং ডিজেলের চাহিদা ১৫ হাজার ৬০০ টন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে ন্যূনতম দুই মাসের উৎপাদন ক্ষমতা রাখার জন্য জ্বালানি তেলের মজুদ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলা এবং বিপিসির সঙ্গে সম্ভাব্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বৈঠক হয়েছে। এই বছর ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালানো হবে।
এ বিষয়ে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সতর্কতার সঙ্গে এটিকে মোকাবিলা করতে হবে। রাতারাতি ডলার সংকটের সমাধান হবে না। তবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে ডলারের যোগান দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, আমরা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। গত বছর ১৫ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ করেছি। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র এসেছে। তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কীভাবে বাড়ানো যায় সেটি নিয়ে পেট্রোবাংলা এবং বিপিসির সঙ্গে বৈঠক করেছি। আশা করি চাহিদা পূরণ করতে পারব। এবার গত বছরের চেয়ে ১ হাজার মেগাওয়াট বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব। তিনি বলেন, গত বছর লোডশেডিং সহনশীল পর্যায়ে ছিল। এবার যদি কিছু শর্টও পড়ে সেটি গতবারের মতো লোডশেডিং সহনশীল পর্যায়ে থাকবে। ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গত বার চলেনি, এবারও লাগবে না। তবে এবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো হবে।







































