
রাজধানী ঢাকায় বেড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল। চালকদের শারীরিক পরিশ্রমের চাপ এড়াতে বিকল্প হিসেবে শুরু হলেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অটোরিকশার সংখ্যা। এতে যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনাও।
এছাড়াও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিস্তার লাভ করা এসব রিকশার ব্যাটারির বিষাক্ত বর্জ্য দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ একাধিক সংকট তৈরি করছে।
এ সংক্রান্ত এক গবেষণার ফল প্রকাশ উপলক্ষে রবিবার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় একথা জানিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন।
সভায় পরিবহন পরিকল্পনাবিদ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, নগর গবেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, গ্যারেজ মালিক এবং রিকশাচালকরাও অংশ নেন।
‘আরবান মবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’শীর্ষক এই গবেষণায় বলা হয়, ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা এমন গতিতে বদলাচ্ছে, যার সঙ্গে নীতিনির্ধারণী কাঠামো তাল মেলাতে পারছে না।
গবেষণায় বলা হয়, দীর্ঘদিনের যানজট ও অপর্যাপ্ত গণপরিবহনে জর্জরিত ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ধীরে ধীরে প্যাডেলচালিত রিকশার জায়গা দখল করেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে সরকারি পরিকল্পনার চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে শ্রমবাজারের বাস্তবতা, যাত্রীদের চাহিদা এবং গ্যারেজভিত্তিক প্রণোদনা। গবেষকেরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এমনভাবে বিস্তার করেছে, যা প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
গবেষণায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ৩৮৪ জন রিকশাচালক, ৩৯২ জন যাত্রী ও ৬৩টি গ্যারেজের মালিকের মতামত নেওয়া হয়েছে।
গবেষণার ফল উপস্থাপন করে ইনোভিশন কনসালটিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সারওয়ার বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন আর সাময়িক কোনও ঘটনা নয়, এটি এখন নগর বাস্তবতা। তার মতে, অস্বীকার বা দমনমূলক অভিযানের বদলে এখন প্রয়োজন কাঠামোবদ্ধ ও ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণরাও ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছেন। রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশার ৩৪ শতাংশ চালক ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সি। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক চালকেরা এখনও প্যাডেল রিকশাই বেশি চালান।
অভিজ্ঞতার ব্যবধান আরও প্রকট। ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রায় ৬০ শতাংশ চালকের অভিজ্ঞতা দুই বছরের কম, বিপরীতে প্যাডেল রিকশাচালকদের গড় অভিজ্ঞতা প্রায় ১৫ বছর। গবেষকদের মতে, কম অভিজ্ঞ চালক ও তুলনামূলক বেশি গতি— এই দুইয়ের সমন্বয় সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন চালকদের প্রায় ৭৫ শতাংশই ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নিচ্ছেন। তারা মূলত তাৎক্ষণিক আয়ের সুযোগে হিসেবে এই পেশা বেছে নিচ্ছেন। এটি গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থানের ঘাটতির প্রতিফলনও বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।
অর্থই এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালকদের ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ জানিয়েছেন, রিকশা বদলের পর তাদের আয় বেড়েছে। প্যাডেল রিকশাচালকদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ। দৈনিক কাজের পরিমাণেও পার্থক্য চোখে পড়ার মতো— প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা চালক দিনে ৩১ থেকে ৫০টি ট্রিপ শেষ করেন, যেখানে প্যাডেল রিকশার ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১২ দশমিক ৬ শতাংশ।
নিজস্ব ব্যাটারিচালিত রিকশা থাকলে একজন চালকের দৈনিক গড় আয় ৯৭০ টাকা। তবে যারা ভাড়া নিয়ে রিকশা চালান, তাদের নিট আয় ৪১৮ টাকা। কারণ, ব্যাটারিচালিত রিকশার দৈনিক ভাড়া গড়ে ৪১৪ টাকা, যা প্যাডেল রিকশার দৈনিক ভাড়ার প্রায় তিনগুণ।
মালিকানা এখনও অধিকাংশ চালকের নাগালের বাইরে। মাত্র ২১ শতাংশ চালক নিজের রিকশার মালিক। যারা কিনেছেন, তাদের ৫১ শতাংশই এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণের ওপর নির্ভর করেছেন, যা ঋণঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি করছে।
যাত্রীদের দিক থেকেও ব্যাটারিচালিত রিকশার চাহিদা বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাত্রীদের ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ কাজের জন্য রিকশা ব্যবহার করেন এবং ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ যাত্রী গণপরিবহনে সংযোগের জন্য।
৭৪ শতাংশ যাত্রী দ্রুত পৌঁছানোর জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন। নিরাপত্তা ও গতি বেছে নিতে বললে ৯৩ শতাংশ যাত্রী গতিকেই অগ্রাধিকার দেন, যদিও ৮২ শতাংশ নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন।
প্রধান ব্যবহারকারীরা হলেন মাসিক ২০–৩০ হাজার টাকার আয়ের যাত্রীরা, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে।
যাত্রীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার হার এবং ভয়াবহতা প্যাডেল রিকশার তুলনায় বেশি। ২১ শতাংশের বেশি যাত্রী এসব দুর্ঘটনাকে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ হিসেবে দেখেছেন, যেখানে প্যাডেল রিকশার ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে, ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা তুলনামূলক কম দুর্ঘটনার কথা জানিয়েছেন। গবেষকরা মনে করছেন, অভিযান বা রিকশা জব্দের ভয়ে অনেক চালক প্রকৃত তথ্য গোপন করেন।
যানজটের বিষয়েও ৬২ শতাংশ মানুষ ব্যাটারিচালিত রিকশাকে দায়ী করেছেন। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল সমস্যা হলো অবৈধ পার্কিং, সড়ক দখল এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা।
ভয়েস ফর রিফর্মের ফাহিম মাশরুর বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা শহরে কর্মসংস্থানের ঘাটতি পূরণ করছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া যেন আরেকটি ‘সিন্ডিকেটনির্ভর’ ব্যবস্থায় পরিণত না হয়।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট অফিসার (অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. সেলিম খান বলেন, নির্ধারিত পার্কিং ও রুট না থাকায় সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও জানান, দেশে অভ্যন্তরীণ বিমানের ভাড়া গড়ে প্রতি কিলোমিটারে ১৫ টাকা হলেও ঢাকায় স্বল্প দূরত্বের রিকশা ভাড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মো. মুসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, প্যাডেল রিকশা চালানোর ফলে চালকদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক চাপ পড়ে। তবে নিরাপদ ও মানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এই চাপ অনেকটা কমানো সম্ভব—যদি তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।
ইউরোপিয় ইউনিয়নের প্রকল্প কর্মকর্তা তাইফ হোসেন সতর্ক করে বলেন, নিরাপদ রিসাইক্লিং ব্যবস্থা না থাকলে সিসা দূষণ বাতাস, মাটি ও খাদ্যচক্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আকিজ মোটরসের মহাব্যবস্থাপক ইফতেখার হোসেন বলেন, দেশে নিরাপদ ও মানসম্মত থ্রি-হুইলার তৈরি করতে বিনিয়োগ করতে মানুষ উৎসাহ পাচ্ছে না, কারণ শুল্ক ৯০ শতাংশেরও বেশি।







































