
ঢাকা মহানগরের সড়কে যানজট নিরসন ও বিশৃঙ্খলা সামলানোর দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। অবশ্য সড়কে চলাচলরতদের অভিযোগ, সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা বা যানজট নিরসনে নয়, বরং গাড়ি চেকিং ও মামলা দেওয়াতেই বেশি আগ্রহ ট্রাফিক পুলিশের।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশ যানজট নিরসন না করে যত্রতত্র গাড়ি চেক করছে ও মামলা দিচ্ছে। এতে সড়কে আরও যানজট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রাইভেট কারের চালক সুমন হোসেন বলেন, ‘সড়কে নিয়ম না মানার কথা বলে যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এসব মামলা দেওয়া হয় বেশির ভাগই নিরীহ ও দুর্বল গাড়ির চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে। যারা প্রভাবশালী, উল্টো পথে গাড়ি চালান তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয় না। সব আইন দুর্বলদের জন্য।’
আরেক প্রাইভেট কারচালক তাজ মনির বলেন, ‘ঢাকার প্রায় প্রতিটি সড়কে অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা, ভিআইপিদের উল্টো পথে চলা ইত্যাদি কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক পুলিশের আগ্রহ যেন মামলাতেই বেশি।’
অবশ্য ট্রাফিক পুলিশ বলছে, ট্রাফিক পুলিশকে হেয় করার জন্য এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। গাড়ির কাগজপত্র সঠিক না থাকলে, ট্রাফিক আইন না মানলে পুলিশ মামলা দেবে এটিই স্বাভাবিক। তা ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন বা নিয়ম মেনে চলাচলে অনীহা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ ইচ্ছা করে মামলা দেয় না। চালকরা অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তা ছাড়া ভিআইপিরাও অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে।’
গত মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর ইস্কাটনে জনকণ্ঠ ভবনের সামনে দিয়ে প্রাইভেট কারে একজন রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন মো. মনির হোসেন নামে এক চালক। হঠাৎ ওই রোগীর পানির পিপাসা লাগে। গাড়িতে পানি না থাকায় রাস্তা ফাঁকা পেয়ে গাড়িটি এক পাশে চাপিয়ে পানি আনতে যান মনির। ঠিক এই সময় রমনা এলাকায় কর্মরত ট্রাফিক সার্জেন্ট রেজা ও ট্রাফিক সদস্য সেলিম এসে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ এনে মনির হোসেনের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেন এবং একটি মামলা দেন। চালক মনির সার্জেন্ট রেজাকে অনুরোধ করেন মামলা না দেওয়ার জন্য। কিন্তু রেজা ও সেলিম বলেন, মন্ত্রীরা সুপারিশ করলেও মামলা দেব। কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। এ সময় গাড়িতে থাকা রোগী বের হয়ে সার্জেন্টকে মামলা না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ, চালককে আমিই পানি কিনতে পাঠিয়েছিলাম, আমার কারণে এমনটি হয়েছে ক্ষমা করে দেন।’ কিন্তু সার্জেন্ট রেজা তাকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা নেই। চুপ করে গাড়িতে বসে থাকেন।’
রাজধানীর মালিবাগে কথা হয় পাঠাওয়ের মোটরসাইকেলচালক শিমুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি মতিঝিল থেকে একজন যাত্রী নিয়ে রামপুরায় যাচ্ছিলাম, এমন সময় রাস্তায় যানজট ছিল। মালিবাগ মোড়ে এসে দেখি ট্রাফিক পুলিশ যানজট দূর না করে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল চেক করছে। এতে করে সড়কে যানজট বেশি দেখা গেছে।’
রাজধানীর পল্টনে কালভার্ট রোডে কথা হয় প্রাইভেট কারের চালক ফয়সাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, রাস্তায় বের হলে একদিকে যানজট, অন্যদিকে ট্রাফিক পুলিশের অত্যাচার।
বাবুবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে প্রতিদিন চলাচলরত ব্যাংকার রিয়াদ হোসেন বলেন, মাসের ৩০টা দিন এই রোডে যানজট লেগেই থাকে। তবে ব্রিজের ওপরে উঠতে গেলে পুলিশ চেক করে এবং নিচে নামলেও ট্রাফিক পুলিশ চেক করে।
শাহবাগে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের ছাত্র শিহাবুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সড়কে ট্রাফিক পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। পুলিশের ইচ্ছা অনুযায়ী চলে গাড়ির চাকা। তাদের মন যখন যা চায় তারা সেটাই করে। যার কারণে নগরবাসীর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের একটি সূত্র জানায়, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না কিছুতেই। ২০১৭-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই সাত বছরে ৫৫ লাখের বেশি মামলা করেছে ট্রাফিক পুলিশ।
ডিএমপির একাধিক ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘মামলা করলেই গাড়ির চালক ও মালিকের কাছে খারাপ হতে হয়, না করলে ভালো থাকা যায়। কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে গাড়ি চেক এবং মামলা করতে হয়। তা ছাড়া মামলা নিয়ে প্রায়ই যানবাহনের চালক ও মালিকদের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে তর্কাতর্কিও হয়। এতে দায়িত্বরত পুলিশের কাজে ব্যাঘাত ঘটে, যার কারণে একটি যানবাহনে মামলা করতে গেলে মূল সড়কে যানজট দেখা যায়। সাধারণ মানুষ আইন মানতে অনেকটা নারাজ। তারা রাস্তায় সুযোগ পেলে ফাঁকফোকর দিয়ে চলে যায়। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের ওপর দায়ভার পড়ে এবং বাধ্য হয়ে পুলিশ মামলাতেই আগ্রহী হয়।’
ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘শৃঙ্খলা ফেরাতে মামলা দেওয়া হলেও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অনেক কষ্ট হয়। অনেক সময় কিছু চালক বিভিন্ন অজুহাত দেখানো থেকে শুরু করে সেই সঙ্গে পেশিশক্তিও প্রয়োগ করে। তার পরও সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।’
জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের এক যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক শক্তির ওপর কিছু নেই। সড়কে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেও অনেকের ক্ষেত্রে পেরে ওঠে না।’
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মুনিবুর রহমান বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক পুলিশ অতিরিক্ত মামলা দেয় এই কথাটা ঠিক না। সাধারণ মানুষ আইন মেনে চলতে অনীহা দেখায়, সেই ক্ষেত্রে রাস্তায় শৃঙ্খলা ধরে রাখতে ট্রাফিক পুলিশ মামলায় আগ্রহী হয়। এ ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।’
সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষা ও যানজট নিরসনের চেয়ে মামলায় বেশি আগ্রহ কেন- ট্রাফিক পুলিশের এমন প্রশ্নের উত্তরে মো. মুনিবুর রহমান বলেন, ট্রাফিক পুলিশ প্রথমে মানুষকে সাবধান করে। সচেতনতার কথা বলে। কাউন্সেলিং করে। একই ঘটনা যখন বারবার ঘটে, তখন পুলিশ মামলা দেয়। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে মামলা তো হবেই। আর মামলা বা প্রসিকিউশনের যে প্রক্রিয়া, সেটা তো সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোরই অংশ। তা ছাড়া ট্রাফিক পুলিশ সব সময় সাধারণ মানুষকে নিয়ে কাজ করে। আইনের চোখে সবাই সমান। সড়কে আইন অমান্য করা চালকদের যানবাহনের নামে মামলা দেওয়া হয়। যাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়, অনেক সময় তারা ট্রাফিক পুলিশকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করতে থাকে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও কাজের কাজ তেমন হচ্ছে না বলে মনে করছেন সড়কে চলাচলরতরা। তাদের দাবি, উল্টো ভোগান্তি আগের চেয়ে বেড়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, মূল সড়কে বেড়েছে অবৈধ স্থাপনা। সঙ্গে আছে অবৈধ পার্কিং, যা মূল সড়কের অনেকটাই দখলে রেখেছে। যদিও কিছু সিগন্যালে দেখা যায় মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে যানবাহন চেক করে ট্রাফিক পুলিশ।
এ বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, নিরাপত্তা প্রটোকলের রেডবুক অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া রাস্তার এক পাশ ফাঁকা করার বিধান নেই। তবে বিদেশি রাষ্ট্রীয় মেহমানদের বেলায় সরকার কেস টু কেস সিদ্ধান্ত নেয়। ভিআইপিদের সাধারণ নিয়মেই চলার নিয়ম। সাইরেন বাজিয়ে রাস্তা ফাঁকা করে কোনো ভিআইপি সড়কে চলাচল করতে পারেন না। মন্ত্রী পদমর্যাদার কেউ সড়কে নামলে পুলিশি নিরাপত্তা পেতে পারেন, চলাচলে বিশেষ সুবিধা নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যয় ঘটে বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।







































