
বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় যাদের রক্তের বিনিময়ে বাংলার মানুষ পেয়েছিল ভাষার অধিকার, সেই ভাষাশহিদদের ফুলেল শ্রদ্ধায় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছে সমগ্র জাতি। ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের দিনটি প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালর কর হয়। তাই বাঙালির ইতিহাসের গৌরব, ভাষাশহিদদের স্মরণে এবারও ফুলে ফুলে ভরে উঠেছিল কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ৭২ বছর পরও দেশের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হয়নি। এখনও সর্বোচ্চ আদালতে ইংরেজিতে অধিকাংশ রায় হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে শুরু করে সাইনবোর্ড, ব্যানার-ফেস্টুন ও বিজ্ঞাপন সবখানেই ইংরেজির দাপট।
ফলে এবারও বাঙালি জাতি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে-বিদেশি ভাষার দাপটে যেন রক্তের দামে কেনা বাংলা ভাষা মøান না হয়ে যায়। অফিস-আদালত বা সবক্ষেত্রে যেন চলে বাংলা, যাতে অক্ষুণ্ন থাকে নিজেদের ভাষার মর্যাদা।
অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরের আগে থেকেই সারা দেশে শহিদ মিনারগুলোর উদ্দেশে জনস্রোত শুরু হয়। এই জনস্রোত এসে মিশেছিল কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারসহ আশপাশের এলাকায়। চারদিকে বেজে ওঠে সেই গান। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি।’ একই সুর বেজে ওঠে শহিদদের স্মরণ করতে আসা সব মানুষের হৃদয়ে। পোশাকে শোকের আবহ। হাতে ফুল। বাদ ছিল না শিশুরাও। ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’-এই প্রতিজ্ঞায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আসা হাজার হাজার মানুষ বাংলা ভাষাকে পাথেয় করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার শপথ নেন।
বুধবার প্রথম প্রহর থেকে দুপুর পর্যন্ত ভাষাশহিদদের স্মরণ করে সমগ্র জাতি। বাঙালির শোক আর অহংকারের এই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। শ্রদ্ধা জানাতে এসে বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবির মধ্য দিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভাষাশহিদদের স্মরণ করে সমগ্র জাতি। ভাষাশহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে ফুল হাতে স্মৃতির মিনারে জড়ো হয় মানুষ। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পাশাপাশি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের শ্রদ্ধার ফুলে ভরে উঠেছে শহিদ বেদি।
এর আগে রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং এর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষাশহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় অমর একুশের কালজয়ী গান-‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ বাজানো হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষা আন্দোলনের বীর শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহিদ মিনারে পুনরায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
অন্যদিকে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ পর্যন্ত ২১ বার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে তার ২১ বারের ২১টি পুষ্পস্তবক অর্পণের দুর্লভ ছবি নিয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। শেখ হাসিনা একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে এই প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শহিদ মিনারে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান। পরে তিন বাহিনী প্রধানরা, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ওয়াকার্স পার্টি এবং জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রথম প্রহরে ফুল দিয়ে স্মরণ করা হয় ভাষাশহিদদের।
এর আগে বুধবার মধ্য রাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকায় উপস্থিত হয়। এ সময় হাজার হাজার মানুষ খালি পায়ে বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’-গানে কণ্ঠ মিলিয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের দিকে এগিয়ে যান। একই সঙ্গে তারা সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের এবং অন্যান্য জাতিসত্তার ভাষা ও বর্ণমালা সংরক্ষণের দাবি জানান। এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও সিনেট সদস্য, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, গণফোরাম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী যুব লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, বাংলা একাডেমি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ভাষাশহিদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে বুধবার সকালে দলের পক্ষ থেকে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহিদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন ও সুজিত রায় নন্দী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সংস্কৃতি সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়েশা খান, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক ফরিদুন্নাহার লাইলী, শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক শামসুন্নাহার চাপা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক আবদুস সবুর, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সৈয়দ আবদুল আউয়াল শামীম এবং উপ-দফতর সায়েম খান উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রভাতফেরি নিয়ে আজিমপুরে ভাষাশহিদদের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শোকের ব্যানার, কালো পতাকা আর কালো ব্যাজ নিয়ে সেখান থেকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গিয়ে তারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, সহসাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক, নির্বাহী কমিটির সদস্য রফিক শিকদার, আমিনুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির দফতর সম্পাদক সাইদুর রহমানসহ দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। একুশের প্রথম প্রহরেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় নেতা জিএম কাদেরের নেতৃত্বে পার্টির নেতাকর্মীরা শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়া জাসদ, বাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, এবি পার্টি, গণসংহতি এবং ছাত্রদল কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা জানায়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শ্রদ্ধা জানিয়েছে অনেক বিদেশি নাগরিক।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে রাজধানীর স্কুল-কলেজ ও পাড়া-মহল্লায়ও ছিল নানা আয়োজন। অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরি করে ভাষাশহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সবাই। এই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বেঁচে থাকবে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা-এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বুধবার ছিল সরকারি ছুটির দিন। ‘শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাতফেরি সহকারে শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। জারি হয় ১৪৪ ধারা। কিন্তু জনস্রোতে ভেঙে যায় সে ধারা। রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। গুলিতে বিদীর্ণ হয় বাংলার সাহসী দামাল সন্তানদের বুক। শহিদ হন রফিক, শফিক, সালাম, বরকত এবং জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে ইতিহাস গড়েন তারা। বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা।
মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গের এই দিনটিকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালে। অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একুশের চেতনার প্রতীক ‘শহিদ মিনার’ এখন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ সব মহাদেশের বহুভাষিক চেতনার স্মারক।







































