
নাহিদ ইসলাম, রাজশাহী ব্যুরো: চলতি বছরের শুরুতেই তীব্র সার সঙ্কটে পড়েছেন রাজশাহীর রাজশাহীর কৃষকরা। বিশেষ করে আলুচাষিরা পড়েছেন বড়ো বিপাকে। অতিরিক্ত দামেও সার পাচ্ছেন না কেউ কেউ। সার কিনতে ডিলারের দোকানের সামনে ভিড় জমাচ্ছেন চাষিরা। কিন্তু সরকারি মূল্যে সার পাচ্ছেন না। তবে অতিরিক্ত টাকা দিলে আবার অনেকেই পাচ্ছেন সেই সার। এক হাজার ৫০ টাকা দামের প্রতিবস্তা ডিএপি সার মিলছে ১৩ থেকে ১৪শ টাকা দামে। টিএসপি কোথাও নাই।
নভেম্বর মাসের বরাদ্দ না আসা পর্যন্ত কোনো ডিলারই টিএসপি দিতে পারছে না। তবে ১৬শ ৫০ থেকে ১৮শ টাকা দিলে আবার এ সারও। বস্তাপ্রতি তিন থেকে চারশ টাকা বেশি দাম দিলে আবার মিলছে এসব সার। ফলে আলুচাষিরা পড়েছেন চরম বিড়ম্বনায়। আলুচাষে খরচও বাড়ছে কৃষকদের। বেশি সংকটে পড়েছেন জেলার তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর ও পবা উপজেলার আলু চাষিরা। জেলার মধ্যে এই উপজেলাগুলোতে আলু চাষ বেশি হয়।
পবার দামকুড়া বাজারের সার ডিলার নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর দোকানে টিএসপি বা ডিএপি সারের সঙ্কট চরমে। সঙ্কটের কারণে কৃষকদের চাহিদামতো সার দিতে পারছে না তিনি। তিন বস্তা চাইলে কাউকে কাউকে কোনোভাবে এক বস্তা দিতে পারছেন। তবে গত দুই তিন ধরে সেটিও পারছেন না। সামনের ডিসেম্বর মাসের নতুন বরাদ্দ পেলে আবার টিএসপি ও ডিএপি সার দিতে পারবেন।
একই অবস্থা তৈরী হয়েছে জেলার প্রায় প্রত্যেকটি উপজেলাতেই। পুঠিয়া, দুর্গাপুর, বাগমারা, চারঘাট ও বাঘা উপজেলাতে ডিএপি স্যার পাওয়া গেল মিলছে না টিএসপি সার। ফলে এসব উপজেলাগুলোতেও আলুচাষিরা এখন বেকায়দায় পড়েছেন। টিএসপি ও এমওপি সার প্রয়োগ করে আলুচাষ শুরু করবেন। কিন্তু সারের সঙ্কটের কারণে আলুচাষ শুরু করতে পারছেন না। তানোরের কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি দরে টিএসপি ও ডিএপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বস্তাপ্রতি তিন থেকে চারশ টাকা অতিরিক্ত দিলে পাওয়া যাচ্ছে সার।
রাজশাহীর পবা এলাকার একজন সার ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কৃষকদের চাহিদা এখন ডিএপি ও টিএসপির সারের প্রতি বেশি। কিন্তু আমরা সেটি দিতে পারছি না। চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনে এনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আজও প্রতিবস্তা ডিএপি সার কিনলাম ১৫শ টাকা করে। সেটি বিক্রি করলাম ১৬ শ টাকা। ১৩৫০ টাকার টিএসপি সার কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে ১৬-১৭শ টাকা দামে। বিক্রি করতে হচ্ছে ১৭-১৮ শ টাকা দামে। কেউ কেউ আরও বেশি দামে বিক্রি করছেন। শুনতে পাচ্ছি, দুই হাজার টাকা দামেও বিক্রি হচ্ছে এক বস্তা সার। কিন্তু আমাদের কিছুই করার নাই।’
তানোর উপজেলা প্রতিনিধি টিপু সুলতান জানান, তানোরে সারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সার কিনতে প্রতিদিন কৃষকরা ডিলারের দোকানের সামনে লাইন ধরছেন । কিন্তু চাহিদা মত সার পাচ্ছেন না তারপরেও। আমার অনেকে সার কিনতে এসে খালি হাতে ঘুরে চলে যাচ্ছেন।
তানোর পৌরসভা এলাকার গোল্লাপাড়া গ্রামের আজগর আলী ও রিয়াজ উদ্দীন বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত সার পাওয়া যাচ্ছে না। সার ডিলার অতিরিক্ত দামে বাইরে সার বিক্রি করে দিচ্ছে। ডিলারদের অতিরিক্ত টাকা দিতে চাইলে গোপনে সার দিচ্ছে। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। প্রয়োজনে সার না পেলে আলু বীজ রোপন করব কিভাবে। তানোর পৌর সভার বিএডিসি সার ডিলাররা সাধারণ কৃষকদের পাত্তা দেয় না। কৃষি অফিসে অভিযোগ করে কোন লাভ হচ্ছে না।
সার ডিলার মাইনুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের চাহিদা মোতাবেক সার দিতে পারছিনা। যে বরাদ্দ দেয় তা দিয়ে কৃষকদের মন রক্ষা করা যাচ্ছে না। আমরা কি করবো। সরকার যেভাবে দেয় আমরা সে মোতাবেক সকলের মাঝে বিতরণ করি। বেশি দামে সার বিক্রি করার প্রশ্নই আসে না। দুর্গাপুর প্রতিনিধি গোলাম রসুল জানান, দুর্গাপুরে ডিএপি ও ইউরিয়া সার পাওয়া গেলেও মিলছে না টিএসপি সার। দুর্গাপুর পৌর বিসিআইসির সার ডিলার মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার গোলাম রসুল জানা, ইউরিয়া আর ডিএপি ছাড়া অন্যান্য সার নাই তাদের কাছে। বরাদ্দকৃত সার পাওয়া গেলেও চাষীদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
খুচরা সার বিক্রেতা শাহ-আলম জানান, আমরা তুলনামূলক সার পাচ্ছিনা। পেলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। যার কারণে বেশি দামে সার বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের কাছে।
সার সংকটের বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা পারভিন লাবনী বলেন, এ উপজেলায় বরাদ্দ অনুযায়ী সার পাওয়া যায়। সারের কোনো সংকট নেই। তবে বাজারে চাষিদের বেশি দামে সার কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন বেশি দামে সার কেনার বিষয়ে আমার জানা নেই। সার সংকট না হওয়ারই কথা। যেহেতু আলু চাষ পুরোদমে শুরু হয়নি। তবে কৃষি জমি বাদে পুকুরের সার প্রয়োগ করায় এ সংকট দেখা দিতে পারে। এদিকে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি নভেম্বর মাসে জেলায় ২২০ জন ডিলারের মাঝে ৭ হাজার ৩০৭ টন ইউরিয়া, ৩ হাজার ১৮৬ টন টিএসপি, ৭ হাজার ৮৩৯ টন ডিএপি ও ৫ হাজার ৬৩৭ টন এমওপি সার বরাদ্দ দেয়া হয়।
আনুমানিক ১৬ হাজার কৃষকের জন্য বরাদ্দ অনুযায়ী প্রায় সব ডিলারই অধিকাংশ সার উত্তোলন করেছেন। কেউ কেউ সবগুলি উত্তোলন করেছেন। আগামী ডিসেম্বর মাসের জন্য ৯ হাজার ২৭৯ টন ইউরিয়া, ২ হাজার ৫৫৬ টন টিএসপি, ৭ হাজার ৯৫১ টন ডিএপি ও ৪ হাজার ৪৪৫ টন এমওপি সার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই সারগুলো ডিসেম্বর মাসের যে কোনো দিন তুলতে পারবেন ডিলাররা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিনকে বার বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে তার দপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বরাদ্দ অনুযায়ী আলু চাষীদের জন্য সারের সংকট থাকার কথা নয়। কিন্তু যারা ইরি বোরো মৌসুমে ধান চাষ করবেন তারাও পরে সার পাবেন না ভেবে এখন সার উত্তোলন করে রেখে দিচ্ছেন। অথচ এখন মূলত আলু চাষের জন্যই সার বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এ কারণে আলুচাষের কৃষকরা সার সংকটে পড়েছেন হয়তো। তবে সার সংকট বেশি বলে জানা নেই।





























