
শিক্ষক শব্দের সাথে মিশে আছে শ্রদ্ধা আর সম্মানের সম্পর্ক। একজন শিক্ষার্থীকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মূল কারিগর শিক্ষক। শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। এবারের স্লোগান- “শিক্ষকের কণ্ঠস্বর: শিক্ষায় নতুন সামাজিক অঙ্গীকার”। দিবসটি উপলক্ষে কয়েকজন তরুণের মতামত জানাচ্ছেন দৈনিক আলোকিত সকালের সাহিত্য বিভাগের প্রধান তানজিদ শুভ্র...
আজকের সমাজে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ
শিক্ষক শব্দটি আমাদের সকলের কাছে অনেক শ্রদ্ধার। কেননা একজন জাতি গড়ার কারিগর কিংবা হাতেখড়ির মানুষটিকেই আমরা শিক্ষক বলে সম্মোধন করি। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে শিক্ষক একজন ম্যাজিশিয়ানের মতোই। কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেন না বরং শিষ্টাচার, নৈতিকতা এবং মানবিক গুণাবলি গড়ে তোলার দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজকের সমাজে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে অবনতি দেখা যাচ্ছে। কতিপয় শিক্ষার্থী শিক্ষকদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করছে এবং উপদেশ মানতে চাচ্ছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া অপমানজনক ঘটনা শিক্ষকদের মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলার অভাব এবং শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধার হ্রাস দেখা যাচ্ছে যা জাতির ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। শিক্ষকদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবমাননা এবং সম্মান না দেখানোর ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। শিক্ষকদের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। যেমন লুনাচারস্কি বলেছিলেন, শিক্ষকরা নতুন প্রজন্মকে মূল্যবান সাফল্য তুলে দেন। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষকেরা এখনও অবহেলিত। বৃটিশ আমল থেকে এখনো তারা ন্যায্য মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বেশি অবহেলিত। তাদের অনেকেই চাকরির শুরুতে এমপিওভুক্ত হননি এবং বছরের পর বছর বেতন না পাওয়ার কারণে শিক্ষাদানে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদান করা হলে একটি শিক্ষিত জাতি গঠনের ভিত্তি তৈরি হবে। শিক্ষার্থীদের উচিত শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা এবং শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হলে শিক্ষার পরিবেশ আরও সুস্থ ও ইতিবাচক হবে।
লেখক: তারেক আল মুনতাছির, শিক্ষার্থী, কক্সবাজার সরকারি কলেজ।
পিছিয়ে পড়া থেকে সেরা: অনুপ্রেরণায় আমার শিক্ষক
সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজে জীবনে জড়িত কোনো শিক্ষককে আমি ভুলতে পারবো না, তবে আমাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য কিছু কিছু শিক্ষক অন্যতমও আছেন। আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিলাম। ৫ম শ্রেণিতে এসে আমার ক্লাস শিক্ষক ছিলেন মনজুর স্যার। তিনি আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। তিনি আমাকে সবসময় বলতেন, “বড় কিছুর স্বপ্ন দেখো তুমিই একদিন সফল হবে”। আমি সেই লক্ষ্য সামনে রেখে পড়ালেখা চালাতে থাকলাম। কিন্তু ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত আমি পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছিলাম একেবারে। আবার নবম শ্রেণিতে উঠার পর আমার পরিচয় হয় এনাম স্যারের সাথে। তিনি আমার জীবনের মোড় পরিবর্তন করে দেন। বছর শেষে ৯ম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে অন্যতম হলাম ১০ম শ্রেণিতেও। এরপর স্কুলের সব শিক্ষক আমাকে আলাদা স্নেহ করতো।
পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার অভ্যাস করান জাহেদ স্যার। স্যারের অনুপ্রেরণায় ‘আমি তপু’ ছিল প্রথম পড়া বই।
প্রত্যেক শিক্ষাস্তরেই এমন গুণিজনের সাক্ষাৎ পাই। কলেজ জীবনে আমিন স্যার তেমনি একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর কথার ধরণে আমি মুগ্ধ হই বারবার। এককথায় আমার শিক্ষাজীবনের সকল শিক্ষক আমার কাছে পৃথিবীর সেরা মানুষগুলোর মধ্যে এক একজন।
লেখক: মোহাম্মদ ছরোয়ার, শিক্ষার্থী, সরকারি আলাওল কলেজ, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
শিক্ষকরা উন্নত দেশ ও আদর্শ জাতি গড়ার কারিগর
শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয় তবে সে মেরুদন্ড সোজা রাখার গুরু দায়িত্ব পালন করেন আমাদের শিক্ষকরা। শিক্ষকরা তাদের মেধা, শ্রম ও জ্ঞান এবং নৈতিকতা দিয়ে আমাদের উন্নত মনের সুশিক্ষিত মানুষ হতে শেখান। তারা আমাদের মাঝে দেশের জন্য কিছু করার, জাতির জন্য কিছু করার পুষ্ট বীজ বপন করে দেন। একটি দেশের সার্বিক উন্নতি নির্ভর করে ঐ দেশের জাতি কতটা সুশিক্ষিত তার উপর। আবার একটি দেশের জাতি কতটা সুশিক্ষিত হবে তা নির্ভর করে ঐ দেশের শিক্ষক সমাজের উপর। তাই আমাদের দেশকে উন্নতির কাতারে নিয়ে যেতে হলে আগে আমাদের শিক্ষকদের সময়োপযোগী জ্ঞান চর্চার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তার সাথে সাথে আমাদের শিক্ষকদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের পরিচালিত করতে হবে। তবেই আমরা হয়ে উঠবো একটি উন্নত দেশের সুশিক্ষিত ছাত্র সমাজ।
লেখক: মোঃ রাকিব, শিক্ষার্থী, সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম।
জ্ঞানের আঙিনার বাতিঘর শিক্ষক সমাজ
একজনই শিক্ষকই পারেন শিক্ষার্থীর শেখার কৌতূহলকে জাগিয়ে তুলতে। আমাদের সেই ছোট থেকে অসীম আকাশের বিশালতার মাঝে নিজেকে মেলে ধরার পেছনে প্রতিটা শিক্ষক এক একটি শেকড়ের ন্যায়। আমার এখনো মনে আছে, আমার শিক্ষক মীর কফিল স্যার বলতেন, কখনো খেয়াল করলে দেখবে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকের জন্য নিধার্রিত চেয়ারে কেউ চাইলেই বসতে পারেনা। এখানে বসতে সম্মান ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। সেই সম্মান কখনো টাকা দিয়ে কেনা যায় না। হয়রত আলী (রা) বলেন, “যার কাছ থেকে আমি একটি হরফ শিখেছি আমি তার দাস, চাইলেই সে আমাকে বিক্রি করতে পারেন।” বহমান সময়ের পরিক্রমায় একজন শিক্ষক দায়িত্বের টানে শিক্ষকতা করতে বহু ত্যাগ স্বীকার করেন। যার মূল্যায়ন যথাযথ সম্মান ও আন্তরিকতা প্রকাশ করলেও কম হয়ে যাবে। প্রতিটি শিক্ষক একটি উজ্জ্বল তারকা হয়ে দীপ্তি ছড়ান শিক্ষার্থীর মানসপটে। আমার শেখা প্রতিটি অক্ষরের বিনিময়ে আজীবন কৃতজ্ঞ শিক্ষকসমাজের প্রতি। ভালো থাকুক জাতি গঠনের কারিগর, সকল শিক্ষক।
লেখক: তৈয়বা খানম, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।
শিক্ষক বেঁচে থাকুক হাজার বছর
শিক্ষা জীবনে সবারই প্রিয় শিক্ষক থাকে; যাদের কথা কখনো ভুলা যায় না। সেটা প্রাইমারি, হাইস্কুল, কলেজে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ই হোক। আমার প্রাইমারিতে পড়ালেখার সময় দুজন শিক্ষক ছিলেন বেশ সহজ সরল কিন্তু আমরা তাদেরকে দেখলে ভয় পেতাম। কারণ ক্লাসের পড়া না হলে কঠিন হতেন। কিন্তু ক্লাস শেষে অনেক সুন্দর করে বুঝাতেন, বাবা ভালোভাবে লেখাপড়া করে অনেক বড় হও, ভালো কিছু করে বাবা-মার, আমাদের শিক্ষকদের সন্মান বয়ে আনো। কীভাবে বাবা মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করবো, শিক্ষকদের সন্মান করবো সব কিছুই শিখিয়েছেন এই স্যার।
স্যার আমাদের গ্রামেরই ছিলেন। স্কুলে আসতেন তার নিজেই বাইসাইকেল দিয়ে। প্রত্যেকদিন মজার কাহিনী হতো। আসার পথে ছোট্ট একটা ব্রীজ ছিল যেখানে স্যার সাইকেল চালিয়ে উঠতে পারতেন না, তিনি নেমে সাইকেল ঠেলে তুলতেন। আর তা দেখে আমরা সবাই খিলখিল করে হাসতাম। স্যার ক্লাসে এসে অনেক রেগে থাকতো। সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে অর্থ্যাৎ আমাকে ডেকে বলতো- তুমি ওখানে হাসলে কেন? আমি তখন উত্তর দিতাম- স্যার, আমি হাসি নাই। তখন স্যার আমাদের উপদেশ দিতেন।
পর্যায়ক্রমে প্রাইমারি শেষে হাইস্কুল, কলেজও শেষ করেছি, এখন অনার্স করছি। সবজায়গায় স্যারদের একই কথা- ভালো করে পড়ালেখা করে ভালো কিছু করে সবার সন্মান রাখা। বাবা-মামার সাথে ভালো ব্যবহার, শিক্ষকদের সন্মান করা। এসব শুনতেই মনে পড়ে শৈশবের প্রিয় শিক্ষকদের কথা যাদের স্মৃতি কোনোদিন ভুলা যাবে না। স্মৃতিগুলো আজও অমলিন কিন্তু সেই দুজন শিক্ষকের কেউ-ই বেঁচে নেই। শিক্ষক দিবসে সকল শিক্ষকদের প্রতি রইলো শ্রদ্ধা। বেঁচে থাকুক হাজার বছর তাঁদের দেয়া ভালোবাসা।
লেখক: লিমন হোসেন, শিক্ষার্থী, ইসলামিয়া সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ।
শিক্ষকরাই প্রকৃত মানুষ তৈরি করতে পারে
শিক্ষক হচ্ছেন পর্বতসমান সম্মানের অধিকারী, যার কোনো তুলনা হয় না। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে খ্যাত শিক্ষকগণকে আমরা কতটুকু সম্মান দিতে শিখেছি কিংবা পেরেছি?
একজন দক্ষ কারিগর যেভাবে সুনিপুণভাবে বিভিন্ন আসবাবপত্রসহ সুন্দর কারুকাজে তৈরি করতে সক্ষম, একজন দক্ষ শিক্ষকও তেমনি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তুলেন আদর্শিকভাবে। শিক্ষকরাই প্রকৃত মানুষই তৈরী করতে পারে। তাঁরা জানেন কীভাবে একজন ছাত্রছাত্রীকে সঠিক নির্দেশনা দিয়ে এগিয়ে নিলে তাঁরা দেশের জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারেন। শিক্ষকদের স্নেহ, ভালোবাসা পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা উদ্যমী হয়ে উঠে। না পারা কাজ মুহূর্তেই করে দিতে সক্ষম হয় কারণ তার পেছনে ঠিকই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন শিক্ষক।
শিক্ষকদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। উদ্যমী শিক্ষকদের আরো উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবী। শিক্ষকরা যাতে অবহেলিত না হয় সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কেউ যদি শিক্ষকের সম্মান ক্ষুণ্ণ করতে কোন অনৈতিক কর্মকান্ড করে তবে তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষকদের আত্মত্যাগ আমাদের মানুষের মতো মানুষ হতে সাহায্য করে।
লেখক: ইকরাম আকাশ, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ।
শিক্ষক হচ্ছেন সভ্যতার ধারক-বাহক
শিক্ষক বিশেষ মযার্দার অধিকারী। দেশ ও জাতি যার দ্বারা উপকৃত হয় তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই, যে নিজে কুরআন শেখে এবং অন্যকে তা শেখায়।”
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড , শিক্ষকরা হচ্ছেন এই মেরুদণ্ড গড়ার কারিগর। শিক্ষকদের আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মান করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর পরে, রাসূলের পরে ওই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা মহানুভব যে জ্ঞানার্জন করে ও পরে তা প্রচার করে।’ বাবা-মায়ের পর শিক্ষকের স্থান। গুরুজনকে সম্মান করার জন্য ইসলাম আদেশ করেছেন। যারা গুরুজনদের সন্মান করে না তারা রাসূল (সা.) এর দলভুক্ত নয়। শিক্ষক বকবেন, মারবেন, শাসন করবেন তাহলেই একটা জাতি স্বর্ণ শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। শিক্ষক আছে বলেই দেশজুড়ে এত এত বীর তৈরি হচ্ছে। শিক্ষক না থাকলে জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হতো। প্রকৃত মানুষ রূপে গড়ে ওঠার পেছনে বাবা-মায়ের চেয়ে শিক্ষকের অবদান কোনো অংশে কম নয়। জীবনের প্রতিটি ধাপে আমাদের সঠিক পরামর্শ দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যান। মা-বাবা শিশুকে জন্ম দেন আর শিক্ষক তাকে মানুষরূপে গড়ে তোলেন। শিক্ষকের বদ দোয়া ধ্বংস অনিবার্য। শিক্ষক ছাড়া একজন শিক্ষার্থীদের জীবন অসম্পূর্ণ ও ব্যর্থ। একটি সুন্দর সমাজ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত সৃষ্টি করেন শিক্ষক।
লেখক: ফাতেমাতুজ জোহুরা তানিয়া, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।





























