
মো আনিছুর রহমান (স্টাফ রিপোর্টার) ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ
৩০ নভেম্বর থেকে শুরু। ৬ ডিসেম্বর সকালের মধ্যেই বিজয়ের খবর আসে, মুক্ত হয়েছে আখাউড়া। এক সপ্তাহের প্রবল যুদ্ধ শেষে বিজয়ের খবরে উল্লাসে ফেটে পড়েন বীর বাঙালিরা। স্থানীয় ডাকঘরের সামনে পতাক উত্তোলন করা হয়। আখাউড়ার বিজয় পূর্বাঞ্চলীয় যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
আজ ৬ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া মুক্ত দিবস। পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত এই আখাউড়াতেই শায়িত আছেন শহীদ সিপাহী বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল। পাকবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আছে একাধিক গণকবর। তবে নো-ম্যানসল্যান্ডে থাকা গণকবর আজো সংরক্ষিত হয়নি।
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বলেছে, ‘আখাউড়া যুদ্ধ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য কৌশলগত অধ্যায়। এ যুদ্ধ প্রমাণ করেছে দৃঢ় মনোবল, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব ও মুক্তির আকাঙ্খাই ছিল পরাজয়-অবধারিত শত্রুর বিরুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের মূল শক্তি।’ ৩০ নভেম্বর ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী : আখাউড়া যুদ্ধ (৩০ নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৭১)’ শীর্ষক শিরোনামে এ মন্তব্য করেছে আইএসপিআর।
এদিকে দিবসটি পালনে দু’দিন ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫ ডিসেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় আখাউড়া পৌর মুক্তমঞ্চে প্রদীপ প্রজ্জলন ও ওয়ার্ক আউট কর্মসূচি পালন করা হয়। ৬ ডিসেম্বরের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, ডাকঘরের সামনে পতাকা উত্তোলন ও আলোচনা সভা।
আইএসপিআর জানায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের অন্যতম কৌশলগত এলাকা ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া। ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট রেল যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় আখাউড়া রেলস্টেশন ও এর আশপাশের অঞ্চল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা দিঘি, উঁচু বাঁধ, রেললাইন ও পাকা স্থাপনাকে ঘিরে শক্ত প্রতিরক্ষা বলয় নির্মাণ করে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী এখানে ব্যাপক ফোর্স মোতায়েন করে। পুরো পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা টিকিয়ে রাখতে আখাউড়া দখলে রাখা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্স ও মিত্রবাহিনীর সমন্বিত পরিকল্পনা এই শক্তিশালী বলয়কেও ভেদ করতে সক্ষম হয়। ৩০ নভেম্বর যুদ্ধের শুরুতেই মিত্রবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী নোয়াপাড়া ও লোনাসার এলাকায় প্রথম আক্রমণ পরিচালনা করে। শত্রুপক্ষের শক্ত প্রতিরোধ সত্তে¡ও দিনব্যাপী এই অভিযান তাদের প্রথম ক্যাম্প ভেঙে দেয়। ১ ও ২ ডিসেম্বর পাকিস্থানি বাহিনীর মূল প্রতিরক্ষা কেন্দ্র আখাউড়া রেলস্টেশন ঘিরে তীব্র লড়াই শুরু হয়।
গঙ্গাসাগরের বাঁধ, রেললাইনের পাড় ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হয়ে মুক্তিবাহিনী ধীরে ধীরে শত্রুর দ্বিতীয় লাইন ভেদ করে। এই দুই রাতে পাকবাহিনী বারবার পাল্টা আক্রমণ চালালেও বড় ধরনের কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী তখন রেলস্টেশনের দক্ষিণাংশে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে পরবর্তী চুড়ান্ত আঘাতের প্রস্তুতি নেয়।
আইএসপিআর আরো জানায়, ৩ ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনী গঙ্গাসাগর রেলস্টেশন সম্পূর্ণ দখল করে। এতে পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষা চুড়ান্তভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে তারা বিকেলে প্রবল পাল্টা হামলা চালায়, যা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। তীব্র প্রতিরোধ সত্তে¡ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পিছু হটেনি। গোলন্দাজসহ বিভিন্ন সহায়ক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তারা রেলস্টেশনের আশপাশ দখলে রাখতে সক্ষম হয়। ৪ ডিসেম্বর শুরু হয় সর্বাত্মক আক্রমণের প্রস্তুতি। মিত্রবাহিনীর মিডিয়াম ব্যাটারি, মর্টার, রকেট লঞ্চার ও পদাতিক বাহিনীর সমন্বিত আক্রমণে আখাউড়ার দক্ষিণ ও পশ্চিম অংশে শত্রুর প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ৫ ডিসেম্বর রাত- চারপাশে যুদ্ধের উত্তাপ। ঠিক এই রাতেই শুরু হয় আখাউড়ার ওপর যৌথ বাহিনীর চুড়ান্ত আক্রমণ। উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণে যৌথ বাহিনীর একযোগে আক্রমণে পাকিস্থানি বাহিনীর সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সকাল ৮টার মধ্যে আখাউড়ার পতন হয়। এই বিজয় পূর্বাঞ্চলীয় যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-আশুগঞ্জ-মন্দভাগ অঞ্চলে মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রা আরও দ্রæততর করে।
আইএসপিআর জানায়, আখাউড়া যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য কৌশলগত অধ্যায়। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে দৃঢ় মনোবল, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব ও মুক্তির আকাঙ্খাই ছিরো পরাজয়-অবধারিত শত্রæর বিরুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের মূল শক্তি।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড আখাউড়া শাখার উপদেষ্টা দীপংকর ঘোষ নয়ন বলেন, ‘৬ ডিসেম্বর আখাউড়া মুক্ত দিবসে পোস্ট অফিসের সামনে যে কয়জন বাংলাদেশের পতাকা উড়ায় তাদের মধ্যে আমার বাবাও ছিলেন। আখাউড়া মুক্ত হওয়ায় একাধিক যুদ্ধের কথা বাবার কাছ থেকে শুনেছি, যা আজো আমাকে শিহরিত করে। বেশ কয়েক বছর ধরেই নানা আয়োজনে ঝাঁকজমকপূর্ণভাবে আখাউড়া মুক্ত দিবস পালন করা হয়।’
বীরমুক্তিযোদ্ধা জমসেদ শাহ্ বলেন, ‘আখাউড়া মুক্ত দিবস মানে আমাদের আনন্দের দিন। বেশ কয়েকদিনের টানা যুদ্ধের পর আখাউড়া মুক্ত হয়। পাকবাহিনী ওইদিন পরাস্ত হয়ে এ অঞ্চল থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। দিবসটি পালনে প্রশাসনসহ মুক্তিযোদ্ধা সন্তানরা নানা কর্মসূচি পালন করেন।’
মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য একাডেমির সভাপতি কবি জয়দুল হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম অধ্যায় হলো আখাউড়া। এখানে ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠর একজন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোঃ মোস্তফা কামালসহ একাধিক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত ছিলো এই আখাউড়া।





























