
মেহজাবিন খান:
শফিক রিয়ান - বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর অমৃতের ঝর্ণা থেকে বয়ে আসা উপন্যাস,কবিতা আমার মন ছুঁয়ে যায়। "আজ রাতে চাঁদ উঠবে না" - তাঁর এমনই এক অমর রচনা যা পাঠকদের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে।
পূর্ণিমা! এই পূর্ণিমায়ই জীবনের নতুন সপ্ন দানা বাঁধে!পৃথিবী থেকে কত মানুষ বিদায়ও নেয়!
গল্পটা মায়া ও সাহেদকে জুড়েই গড়ে উঠেছে।
এছাড়াও অনেক জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছেন মাস্টার আতাউর রহমান, হাজি মজিদ, আনোয়ারা, তিথি, শিক্ষক রতন!
কোনো এক পূর্ণিমায়ই মা - বাবার ঘর আলো করে জন্ম নেয় মায়া ভরা নবজাতিকা মায়া। খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠে মাস্টার আতাউর রহমান। মেয়ের খুশিতে মিষ্টি কিনতে যান দোকানে। কিন্তু বাড়ি ফিরে আসার পর এক পৃথিবী তার মাথায় যেনো ভেঙে পড়লো! মায়া ভরা মেয়েকে মাতৃহারা করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো জননী! এই মেয়েকে নিয়ে শুরু হলো একা জীবন পার। বাবাই হয়ে উঠলো তার পিতা, তার মাতা! এভাবেই বেড়ে উঠতে থাকে মায়াভরা মায়া।
মায়া পুরুষজাতিকে অনেক ঘৃণা করে। কারণ তারা পুরুষ বলেই!কিন্তু সাহেদ। সে সবার থেকে আলাদা, তার সাথে পুরুষজাতির তুলনা হয় না। মায়া সাহেদকে প্রচন্ডরকম ভালোবাসে। এতো ভালোবাসে বলেই হয়তো সবসময় হারানোর ভয় পায়! বৃষ্টিস্নাত কোনো এক দিনেই মায়া সাহেদকে আবিষ্কার করেছিলো।
তিথি নামের এই সাহসী মেয়েটার সাথে মায়ার কলেজের প্রথমদিনেই আলাপ হয়। এরপর তারা কবে যে বন্ধু হয়ে উঠলো! তিথির মতো এমন মেয়ের সাথে বন্ধু না হয়ে থাকা যায়? তিথির কাছ থেকেই প্রথম জেনেছিলো শিক্ষক নামের এই অসুর রতন কীভাবে মেয়েদের বিবেচনা করে! তার কাছে সব মেয়েই ভোগের বিষয়। শিক্ষক জাতির জন্য কলঙ্কময় এই রতন নানাভাবে তিথিকে বিরক্ত করতো। কত খারাপ ভাষায় তাকে ম্যাসেজ দিয়ে ডিস্টার্ব করতো! যা মুখে বলার মতো না।
এই তিথি আর মায়াই তাদের মতো আরও মেয়েদের নিয়ে পুরুষ নামক এই অসুরদের বিরুদ্ধে গড়ে তুললো প্রতিরোধ। তারা সফলও হলো! কিন্তু এই অসুরদের স্বভাব কি কখনো বদলায়? তারা কি এক নিমিষেই সাহেদের মতো ছেলে হয়ে উঠতে পারে?
আজ ১২ ই ভাদ্র। মায়ার জন্মদিন। মধ্যরাতে প্রথম উইশটা করলো তিথি। কিন্তু মায়া সে তো বসে আছে তার সাহেদের অপেক্ষায়। কখন একটা নোটিফিকেশন আসবে। মায়ার মন বিষন্নতা কাটলো। সাহেদ তাকে কোনো কিছুই পাঠালো না! এই বিষন্নতা নিয়েই শুরু হলো সকালটা। সারাদিন এভাবেই কাটতে থাকলো।
আজ বিকেলে সে তার বাবা, হাজি মজিদ আর আনোয়ারার সাথে মধুপুর গেলো, বাউল গানের আসরে অংশ নিতে। বাউলের গানের মতো তারও ইচ্ছে করছে,
❝আমি অপার হয়ে বসে আছি, ওহে দয়াময়,
পারে লয়ে যাও আমায়। ❞
হঠাৎই সাহেদের ম্যাসেজ আসে,
❝মায়া আমায় ক্ষমা কর। ইচ্ছে করেই তোমায় শুভেচ্ছাবার্তা জানাইনি আমি। ইচ্ছা ছিল সামনে এসেই এই বিশেষ দিনটাকে উৎযাপন করব দুজন। অপেক্ষায় ছিলাম তুমি আসবে। কিন্তু এলে না। আমি বসে ছিলাম অভিমান করে। কিন্তু বল, তোমার উপর কি অভিমান করে থাকা যায়? যায় না। তাই অগত্যা তোমার কাছে আসতেই হলো। আমি ভীষণভাবে ক্ষমাপ্রার্থী মায়া। ভালোবাসা নিও। আর হ্যা, শুভ জন্মদিন মায়া।❞
মায়া ম্যাসেজটা পড়ে। মন ভালো হয়ে যায় মায়ার। কিন্তু এত দেরি করে শুভেচ্ছা জানানোই এখনো কিছুটা রেগে আছে মায়া। এই রাগও বেশিক্ষণ টিকবে না। জোছনার আলো ছড়িয়ে যাবার সাথে সাথে ম্লান হয়ে যাবে জমে থাকা মান-অভিমানের পালা। মায়া গানের আসর থেকে চলে আসে। বাইরে একা একা বসে সাহেদের কথা ভাবছিলো। আজ চেয়েছিলো সে তার এক কলঙ্কময় রাতের কথা সাহেদকে বলবে। কিন্তু! তার তো সাহেদের সাথে দেখাই হলো না!
সাহেদও আজ তার মনের সব কথা বলতে চেয়েছিলো মায়াকে।তাই এই রাতেই সে মধুপুরের উদ্দেশ্য রওনা দিলো।
মায়ার শরীরে কার যেন স্পর্শ!কিন্তু সাহেদ নয় এটা সে ভালো করেই জানে। মায়া দুই হাতে প্রচণ্ড চেষ্টা করেও হিংস্র থাবা থেকে নিজেকে মুক্তি দিতে পারছে না। তবে কি মায়ার জীবনের প্রদীপ এখানেই নিভে যাবে? এই আনন্দের দিনে? অসুরের হাত মায়ার মুখের খানিকটা নিচে নেমে আসে। মায়াও সেই সুযোগটি হাতছাড়া করেনি। কামড় বসিয়ে দেয় তার হাতে। এক মুহূর্তের জন্য হাত সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় হিংস্র জানোয়ারটা। সেই সুযোগে আকাশ মাটি প্রকম্পিত করে চিৎকার দিয়ে ওঠে মায়া। কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম চিৎকারের আওয়াজে। তবে, গানের আসরের তুমুল হৈ-হল্লার ভিড়ে হারিয়ে যায় মায়ার আর্তনাদ।
জানোয়ের মতো অসুরটা আবার চেপে ধরে মায়ার মুখ। এবার আর কোন সুযোগ পায় না মায়া। বাঘ যেভাবে তার শিকারকে কাবু করে, ঠিক সেভাবে ক্রমশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে মায়াকে। মায়ার চোখে ভেসে ওঠে তার শৈশবের রক্তে রঞ্জিত হাফ প্যান্টের দৃশ্য।ওই কলঙ্কময় রাতের কথা। এমন অবস্থায় মায়া ভাবে তার পরিণতির কথা। ভেবে নেয় আগামীকালের খবরের শিরোনাম কেমন হবে- 'ধর্ষণের পর খুনের শিকার এক সাহসী নারীর, যিনি যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।' এটা ভেবেই মায়া শান্তি পায়। তার নামের আগে নিশ্চয়ই 'সাহসী' শব্দটা লেখা থাকবে। সাহেদ কি সেটা পড়ে দেখবে? তার তো পত্রিকা পড়ার অভ্যাস নেই। ভাবনাতেই শেষ হয়ে যায় মায়া নামক অধ্যায়ের শেষ অংশটুকু।এগুলো ভাবতে ভাবতেই এই পূর্ণিমা রাতে যখন সে জন্মিয়েছিলো সেই রাতেই সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলো!
সাহেদ এসে শুধু মায়ার রক্তাক্ত দেহটাই পেলো। তার আর কোনোদিন মায়ার সাথে মনের কথাগুলো বলা হবে না। মায়ারও তার জীবনের কথাগুলো সাহেদকে জানানো হলো না।
কিন্তু এই পৃথিবীর বাকি মানুষগুলো কি জানে কে আসল অপরাধী! সাহেদকেই কেন মিথ্যে অপরাধী হতে হলো! তার কি দোষ ছিলো, সে তো সেই হিংস্র নরদানব না।
সে শুধু মায়াকেই ভালোবেসে পৃথিবী উজার করেছিলো।
এমন আরও কত ভালোবাসাগুলো মরে যায়, হিংস্র এই অপরাধীদের কারণে।ভালোবাসার মানুষগুলো হয়ে যায় অপরাধী আর অপরাধীরা নিদারুণ কোনো বাধা ছড়াই জঘন্য কাজগুলো করে বেড়ায়! বাকি মানুষগুলোর তা অজানাই রয়ে গেলো। সত্যি আজ রাতে চাঁদ উঠবেনা!
বইটি মূলত উপন্যাস হলেও লেখক জীবনের পাশাপাশি সমাজের এই জঘন্যতম অপরাধের বিষয়টি ভালোভাবে তুলে ধরেছেন।প্রতিদিন কতো তরুণী, কত নারী এসব জঘন্য মানুষের কাছে তাদের জীবন দিচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই!
বই : আজ রাতে চাঁদ উঠবে না
লেখক : শফিক রিয়ান
প্রকাশনী : বইমই
মুদ্রিত মুল্য : ২৭৫ টাকা







































