
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মির্জানগর গ্রামের গ্রাম্যচিকিৎসক আশরাফুল হক। ওই গ্রামে তার পাঁচ বিঘা জমিতে মেহগনিগাছের বাগান রয়েছে। গত সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পারেন, পদ্মা নদীসংলগ্ন তার ওই বাগানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখেন ২০টি গাছসহ অন্তত ৫ শতাংশ জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। তখন তিনি অবশিষ্ট গাছগুলো কাটতে শুরু করেন।
গাছ কাটার ব্যস্ততার ফাঁকে বলেন, ‘দেড় মাস আগে থেকে পদ্মায় ভাঙন শুরু হয়েছে। মাঝে কিছুদিন বন্ধ ছিল। নদীর পানি কমার কারণে এখন ভাঙন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। রবিবার বিকেলেও নদী ছিল আমার বাগান থেকে অনেক দূরে। কিন্তু সকালেই বাগানের বড় একটি অংশ নদীতে তলিয়ে গেল।’
অন্যদিকে শেষ সম্বল বসতভিটা হারিয়ে আরও বিপাকে পড়েছেন একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক। গত মঙ্গলবার সকালে চোখের সামনে তার মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু গ্রাস করে নেয় সর্বনাশা পদ্মা। চোখভরা পানি নিয়ে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘যেটুকু জমিতে চাষ করে সংসার চালাতাম সেটা আগেই গেছে। এবার থাকার জায়গাটাও গেল। পরিবার নিয়ে এখন কোথায় উঠব।’
কুষ্টিয়ার প্রমত্তা পদ্মা নদী রাক্ষুসী রূপ ধারণ করেছে। পানির তোড়ে মিনিটে মিনিটে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে বসতবাড়ি, ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী জাতীয় মহাসড়ক। বিশেষ করে মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার চার ইউনিয়নের প্রায় ১১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকার হাজারও মানুষ চরম ভাঙন-আতঙ্কে রয়েছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে বসতভিটা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে নদীতে চলে গেছে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের দুটি টাওয়ার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে প্রাথমিকভাবে ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া ও সাহেবনগর, মির্জানগর এবং তালবাড়িয়া গ্রামে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সাহেবনগর এলাকায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পদ্মা নদীতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের ৭২৮ মিটার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পদ্মার পানির উচ্চতা গড়ে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ সেন্টিমিটার কমে গিয়ে স্রোত আরও তীব্রভাবে কূলে আঘাত হানছে।
পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, যেভাবে নদীভাঙন হচ্ছে, তাতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও ৩০ থেকে ৩৫ মিটার ভেঙে লোকালয়ের দিকে চলে আসার শঙ্কা রয়েছে। তখন কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী মহাসড়ক থেকে নদীর দূরত্ব হবে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মিটার। তাই বলা যায়, এই মহাসড়ক এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অন্তত ১ হাজার ১৮৮ একর ফসলি জমি পদ্মায় বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া চলতি মৌসুমে ১৮৬ মিটার গ্রামের জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। গত ১২ অক্টোবর থেকে পানি কমতে শুরু করায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের প্রায় ৭২৮ মিটার পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। গত কয়েক দিনে মির্জানগর এলাকার একটি কবরস্থানের বেশির ভাগ অংশ বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া সাহেবনগর, মির্জানগর ও রানাখড়িয়া এলাকার কয়েকটি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পাউবো জানায়, ভাঙন ঠেকাতে প্রায় ৫৫ হাজার জিও ব্যাগ ও ৩ হাজার ২০০টি টিউব ফেলা হয়েছে। নদীর গভীরতা বেশি ও তীব্র স্রোত থাকায় জিও ব্যাগ ফেলার সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এতে মহাসড়কের দিকে পদ্মার ভাঙন এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পানি কমতে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে আরও অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ মিটারজুড়ে ভাঙনের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কুষ্টিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, মাসখানেক আগে পানি বাড়ার সময় ভাঙন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এখন নদীর পানি কমার কারণে তীব্র স্রোত আর ঘূর্ণিপাকে ভাঙন তীব্র হয়েছে। যেভাবে ভাঙছে তাতে মহাসড়ক খুবই ঝুঁকির মধ্যে আছে। ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় সমস্যা বেশি দেখা দিয়েছে।





























