
আরাফাত আলী,স্টাফ রিপোর্টার:
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি সম্পদ ব্রীজের রড চুরি করে বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মোঃ হাসান নামের এক ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। উপজেলার দুদলী এলাকায় অবস্থিত একটি পুরাতন ব্রীজ ভেঙে পাওয়া আনুমানিক দেড় লক্ষাধিক টাকার রড কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই চুরি করে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে দুদলী পুরাতন ব্রীজ ভেঙে সেখানে নতুন ব্রীজ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী, ব্রীজ ভাঙার পর উদ্ধারকৃত পুরাতন রড ও অন্যান্য সামগ্রী সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের ওপর ন্যস্ত ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই দায়িত্ব লঙ্ঘন করে কয়েক মাস আগে ঠিকাদার এসব রড মৌতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের কাছে চুরি করে বিক্রি করে দেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, পুরাতন সরকারি রড বা নির্মাণ সামগ্রী বিক্রির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে রেজুলেশন গ্রহণ,মূল্য নির্ধারণ এবং প্রকাশ্য নিলামের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ এসব নিয়ম সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্তে রড বিক্রি করা হয়েছে, যা আইন বহির্ভূত ও দণ্ডনীয় অপরাধ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এদিকে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন দাবি করেছেন, দুদলী ব্রীজের পুরাতন সব রড চুরি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে তিনি গত ৭ জানুয়ারি কালিগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানান।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ওই পুরাতন রড কয়েক মাস আগেই বিক্রি করা হয়েছে। অথচ ঘটনার দীর্ঘ সময় পর থানায় জিডি করা হওয়ায় সময়গত অসামঞ্জস্যতা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, রড বিক্রির বিষয়টি জানার পরও তাৎক্ষণিক কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নিয়ে হঠাৎ জিডি করা হয়েছে, যা বিষয়টিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে।
এ ঘটনায় শুধু ঠিকাদারের ভূমিকাই নয়, উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্ব ও তদারকির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা যথাযথ ছিল কিনা তা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ ও সন্দেহ বাড়ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৌতলা বাসস্ট্যান্ড দোকান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভাঙারি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “দুদলী ব্রীজের কাজ যিনি প্রথমে পেয়েছিলেন, তিনি পরে কাজটি মোঃ হাসান নামের আরেক ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেন। কয়েক মাস আগে তিনি হাসানের কাছ থেকে পুরাতন কিছু রড ৭৭ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছেন।
অন্যদিকে বর্তমান ঠিকাদার মোঃ হাসান দাবি করেন, পুরাতন ব্রীজ ভাঙার পর রডগুলো ঘটনাস্থল থেকেই চুরি হয়ে গেছে। তিনি রড বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করলেও উপজেলা প্রকৌশলীকে ৬৭ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে বলে স্বীকার করেন।তবে জরিমানাটি কোন অপরাধের জন্য এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি রড তার হেফাজতে থাকা অবস্থায় চুরি হওয়ায় এ জরিমানা দিতে হবে। তার এ বক্তব্যে রড চুরি, বিক্রি ও জরিমানার বিষয়টি নিয়ে আরও অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, রেজুলেশনের মাধ্যমে দুদলী ব্রীজের পুরাতন রড নিলামের জন্য ৬৭ হাজার টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নিলাম শুরুর আগেই রডগুলো চুরি হয়ে যায়। এ কারণে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।”
রডগুলো চুরি হয়নি বরং বিক্রি করা হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “চোরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বা মামলা করার এখতিয়ার আমার নেই। এটি পুলিশের দায়িত্ব। আইন অনুযায়ী পুলিশ যা করবে, সেটাই কার্যকর হবে।”
কালিগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক নাজমুল হোসেন জানান, দুদলী ব্রীজের পুরাতন রড হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় উপজেলা প্রকৌশলীর করা একটি সাধারণ ডায়েরি তদন্তের জন্য তার ওপর ন্যস্ত রয়েছে। বিষয়টি নথিভুক্ত হয়েছে এবং তদন্ত শুরুর জন্য ইতোমধ্যে বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আদালতের অনুমোদন পাওয়া মাত্রই ঘটনার সার্বিক তদন্ত শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।
এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সম্পদ এভাবে লুটপাট হলে উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারা দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিক্রি হওয়া সরকারি সম্পদ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।





























