
মোতালেব হোসেন (কুমিল্লা)।। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা জেলায় রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রাধান্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৮টিতে দলটির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। বাকি তিনটি আসনের মধ্যে একটিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, একটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তবে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত প্রার্থীও বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত নেতা। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় আগে থেকেই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।গত ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রশাসন।ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্রগুলোতে শুরু হয় গণনা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এদিন অনুষ্ঠিত গণভোটেও অংশ নেন ভোটাররা। ফলাফল সংগ্রহ ও ঘোষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয় কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মু. রেজা হাসানের সম্মেলন কক্ষে। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী, এজেন্ট ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে একে একে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল ঘোষণা করা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যম নিজস্ব সূত্রে ফলাফল প্রচার করতে থাকে।আসনভিত্তিক ফলাফলের চিত্রঃ কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা): বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১,৪০,৩০৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মনিরুজ্জামান বাহাউল পান ৯০,৪৯৯ ভোট। এই আসনে বিএনপি বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে। কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস): অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া (বিএনপি) ৭৬,২৬৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আব্দুল মতিন পান ৬২,৩৮৫ এবং জামায়াতের নাজিম উদ্দিন পান ৫০,১৩৬ ভোট। ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকেন। কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর): শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ (বিএনপি) ১,৫৮,০৯৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জামায়াতের মো. ইউসুফ সোহেল পান ১,০৪,৫৮০ ভোট। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব এ আসনে আবারও প্রতিফলিত হয়েছে। কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার): এনসিপির প্রার্থী হাসানাত আব্দুল্লাহ ১,৬০,৫২৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। গণঅধিকার পরিষদের জসিম উদ্দিন পান ৪৯,৬৪৪ ভোট। এ আসনে এনসিপির জয়কে অনেকে ‘চমক’ হিসেবে দেখছেন। কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া): বিএনপির হাজী জসিম উদ্দিন ১,৩৪,৪৮৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জামায়াতের ড. মোবারক হোসাইন পান ১,২৪,৫৪৭ ভোট। এ আসনে ভোটের ব্যবধান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কুমিল্লা-৬ (সদর ও সদর দক্ষিণ): বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরী ১,৯৯,৩৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের কাজী দ্বীন মোহাম্মদ পান ১,১৪,২২৬ ভোট। এ আসনে বিএনপি শক্ত অবস্থান ধরে রাখে। কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা): স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম শাওন ৯০,৮১৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির ড. রেদোয়ান আহমেদ পান ৪৭,৯২৫ ভোট। দলীয় বিদ্রোহের প্রভাব এখানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কুমিল্লা-৮ (বরুড়া): বিএনপির জাকারিয়া তাহের সুমন ১,৬৭,৪৮৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জামায়াতের অধ্যক্ষ শফিকুল আলম হেলাল পান ৪১,২০৯ ভোট। এই আসনে বিএনপি বড় ব্যবধানে জয় পায়। কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ): মো. আবুল কালাম (বিএনপি) ১,৬৮,১০৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। জামায়াতের অধ্যাপক সরওয়ার আলম সিদ্দিকী পান ১,১৩,৪৫৪ ভোট। কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট-লালমাই): মোবারেক আলম ভূঁইয়া (বিএনপি) ১,৬১,৮৪৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জামায়াতের মুহাম্মদ ইলিয়াস আরাফাত পান ১,১৬,১৫০ ভোট। কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম): বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের ১,৩৩,৩০৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির মো. কামরুল হুদা পান ৭৬,৬৩৮ ভোট। এ আসনে জামায়াত নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে। জেলার ফলাফলে বিএনপির স্পষ্ট আধিপত্য দেখা গেলেও কয়েকটি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। বিশেষ করে চান্দিনা ও দেবিদ্বার আসনে দলীয় সমীকরণ ভিন্ন আকার ধারণ করে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক শক্তিই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। এদিকে নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে প্রশাসন সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণা সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে এ ফলাফল নতুন সমীকরণ তৈরি করবে এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এখন দৃষ্টি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আগামী দিনের কার্যক্রম ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের





























