
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনী ও আরকান আর্মিসহ সশস্ত্র বিদ্রোহগোষ্ঠীর মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে নাফ নদের ওপর নির্ভরশীল জেলেদের ওপর। মাছ ধরতে নাফ নদে নামতে না পারায় জেলে এবং তাদের পরিবারের মধ্যে হাহাকার নেমে এসেছে। স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, ওপারের সংঘাতের কারণে এপারের জেলেদের নিরাপত্তার কারণে মাছ শিকার বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও মাদক পাচার বন্ধ ও অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্যই নাফ নদে জেলেদের না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফের বালুখালী পাশর্^বর্তী হোয়াইক্যং এলাকার সীমান্তের ওপারে থেমে থেমে গোলাগুলির বিকট শব্দ শোনা গেছে। মিয়ানমার অভ্যন্তরে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় এপারে সীমান্তে লাগোয়া বসবাসরত জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ এমনই ঘটনায় এর আগে অনেকেই হতাহত হয়েছে। রোববার সকাল ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঢেকুবনিয়া, রাইট ক্যাম্প ও বাইশপারী এলাকার সীমান্তে মিয়ানমারের ভেতরে এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গতকাল টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায় বেশ কয়েক রাউন্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয়রা জানায়। তবে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ অন্য দিনের চেয়ে গতকাল ছিল শান্ত।
মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার ফলে রোহিঙ্গারা দলে দলে এ দেশে পালিয়ে আসার প্রেক্ষিতে অঘোষিতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে জেলেদের মাছ শিকার। ২৩ অক্টোবর থেকে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও সাগরে মাছ শিকার শুরু হলেও টেকনাফের নাফ নদে মাছ শিকার অঘোষিত বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ ইয়াবা চোরাচালান এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি। একটানা মাছ শিকার বন্ধ থাকার ফলে নাফ নদনির্ভর জেলে পরিবারগুলোতে নেমে আসে দুর্দশা। বিকল্প কোনো আয়ের উৎস না থাকায় জেলে পরিবারের মধ্যে চলছে হাহাকার। অনেকেই দুবেলা খাদ্য জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানা গেছে। মাছ শিকার বন্ধ থাকায় নাফ নদের পার্শ্ববর্তী বাজারগুলোতে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া টেকনাফে মিঠাপানির মাছ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে নাফ নদ ও সাগরের মাছের ওপর পুরো উপজেলা নির্ভরশীল।
গতকাল নাফ নদের ওপর নির্ভর জেলেরা তাদের দুর্দশার কথা জনিয়েছেন। হ্নীলা ফুলের ডেইলের জেলে হারুন উর রশিদ বলেন, ‘কর্ম বছরের পর বছর ধরে নাফ নদে জাল পেতে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। কোনো সময় এভাবে দীর্ঘদিন মাছ শিকার বন্ধ থাকেনি। মাছ শিকার করতে না পারায় পরিবার নিয়ে কষ্টে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে।
হ্নীলা জেলেপাড়ার জেলে কাশীরাম দাস বলেন, আয়-রোজগার নেই। ফলে এক বেলা খেতে পারলেও আরেক বেলা খেতে খুব কষ্ট হচ্ছে। নদীতে টানা জাল ও কাঁকড়া শিকার করে সংসারের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো হতো। নাফ নদে মাছ শিকারে গেলে বিজিবি জওয়ানরা বাধা সৃষ্টি করছে এবং মাছ শিকার বন্ধে ‘ওপরের নির্দেশ’ আছে বলে জেলেদের জানান বিজিবি জওয়ানরা।
মাছ ব্যবসায়ী ইউছুপ আলী বলেন ‘জেলেদের মাছ ক্রয় করে তা বাজারে বিক্রি করে সংসার চলত। এখন মাছ শিকার বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে খুব মুশকিল। বিকল্প কোনো কাজও করতে পারছি না।’
এভাবে নাফ নদের ওপর নির্ভর টেকনাফ উপজেলার প্রায় ১২ হাজার জেলে ও তাদের পরিবার প্রায় ৬-৭ বছর ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিগগিরই নাফ নদে মাছ শিকার থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানায় জেলে পরিবারগুলো।
এ ব্যাপারে টেকনাফ সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, মিয়ানমারের সহিংসতা, পাচার ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সরকারি নির্দেশে নাফ নদে মাছ শিকার বন্ধ রয়েছে।





























