
স্টাফ রিপোর্টার :
রংপুরের পীরগাছায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হক সুমন। বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে কর্মরত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় সমান অভিযোগ তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টিম।
দুদকের উপপরিচালক (ডিডি) মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি দল গত বৃহস্পতিবার উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নের ‘শল্লার বিল’ আশ্রয়ণ প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কারিগরি বিষয়গুলো যাচাইয়ের জন্য একটি টেকনিক্যাল টিমও কাজ করছে। শুনানির জন্য সাবেক ইউএনও নাজমুল হক সুমন ও সাবেক পিআইও আব্দুল আজিজকে ডাকা হলেও সুমন উপস্থিত হননি। অভিযোগ রয়েছে, নিজের প্রভাব খাটিয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন দপ্তরের তদন্ত ধামাচাপা দিলেও এবার দুদকের হাত থেকে বাঁচতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি।
দুর্নীতির যত চাঞ্চল্যকর তথ্য
তদন্তে ও স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে দুর্নীতির লোমহর্ষক সব চিত্র:
১. ঘর নির্মাণে পুকুরচুরি: মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে শল্লার বিলে ৪৩০টি ঘর নির্মাণের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি ঘর থেকে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে ১ লাখ টাকা করে মোট ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ফলে ঘরগুলো এখন ঝুঁকির মুখে।
২. মাটি ভরাট ও বালু বিক্রি: প্রকল্পের ভূমি ভরাট করতে ৫৬৬ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ থাকলেও নিয়ম ভেঙে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হয়। সেই বালু ও মাটি বাইরে বিক্রি করে আরও প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা পকেটে ভরেন ইউএনও ও তার সহযোগীরা।
৩. টোকেন বাণিজ্যে কোটি টাকা: স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিটি ঘর বরাদ্দের বিনিময়ে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউএনও’র বিশেষ ‘টোকেন’ পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
৪. সুযোগ-সুবিধা নেই: প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প বলা হলেও বাস্তবে এই আশ্রয়ণে নেই কোনো স্কুল, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান বা ক্লিনিক। এমনকি ১০টি পরিবারের জন্য মাত্র একটি টিউবওয়েল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা চরম পানীয় জলসংকট তৈরি করেছে।
আওয়ামী কানেকশন ও ফাইল গায়েব
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ায় নাজমুল হক সুমন গত ৫ আগস্টের পরেও বহাল তবিয়তে ছিলেন। তাকে এই বিশাল অনিয়মে সহায়তা করেন অন্নদানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান সংগ্রাম। এমনকি বদলির পর রাতে অফিসে এসে দুর্নীতির নথি ঘষামাজা করার অভিযোগ রয়েছে তার সহযোগী অফিস সহকারী রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে।
বিচারের অপেক্ষায় ভুক্তভোগীরা
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুস ছালামসহ শল্লার বিলের বাসিন্দারা এই ‘লুটপাটের’ দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন। তারা জানান, সরকারি টাকা চুরি করে ইউএনও ও ঠিকাদাররা আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও ভূমিহীনরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
দুদকের সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন জানান, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্পের প্রতিটি খুঁটিনাটি যাচাই করা হচ্ছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, অভিযুক্ত সাবেক ইউএনও নাজমুল হক সুমনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। বর্তমান ইউএনও দেবাশীষ বসাক জানিয়েছেন, দুদক টিমকে তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করছে উপজেলা প্রশাসন।





























