
উত্তরাঞ্চলের শস্য ভাণ্ডার খ্যাত জেলা বলা হয় বগুড়াকে। রকমারি ফসল ফলানোর দিকে সারাদেশের মধ্যে এ জেলার কৃষকদের একটা আলাদা পরিচিতও রয়েছে।
এ জেলায় এখন ফসলের মাঠ ছেয়ে আছে সোনা রঙে।
একদিকে বিস্তীর্ণ মাঠে শোভা পাচ্ছে রোপা-আমন মৌসুমের আধাপাকা ধান। অন্যদিকে অনেক কৃষক উৎসবমুখর পরিবেশে পরিপুষ্ট ধান কাটা-মাড়াই করে গোলায় ভরছেন। উৎপাদিত ফসলের বাম্পার ফলনে বেশ খুশি জেলার কৃষকরা।
মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলার কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
বগুড়ায় রকমারি ফসল ফলানোর দিকে সারাদেশে এ জেলার কৃষকদের একটা আলাদা পরিচিত রয়েছে। এ জেলাকে উত্তরাঞ্চলের শস্য ভাণ্ডার খ্যাত জেলা বলা হয়। এখানকার উৎপাদিত ফসল রাজধানী ঢাকাসহ যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এ তালিকার শীর্ষে থাকে ধান, চাল ও নানা রকমের সবজি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কেবলই সোনারঙা ধানের সমারোহ। ধান গাছের ডগায় থোকায় থোকায় পুষ্ট ধান ঝুলছে। ধানের শীষে সোনারঙ ধারণ করেছে। অনেক ধান পুষ্ট হলেও কিছু ধান এখনো কাঁচা রয়েছে। অনেকে জমির ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ শেষ করেছেন। কৃষাণ ও কৃষাণীরা তাদের সে ধান শুকানোর কাজে সময় ব্যয় করছেন। অনেকেই তাদের উৎপাদিত ফসল রোদে শুকিয়ে ঘরে ও হাটে তোলার প্রস্ততি নিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে ধান নিয়ে গ্রামীণ জনপদগুলোয় কৃষকদের এক ধরনের কর্মযজ্ঞ চলছে। এ জেলার কৃষকেরা অনেক পরিশ্রমী। চাষাবাদের শুরু থেকেই হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে যান কৃষকরা। তাদের চোখের সামনেই তরতর করে বেড়ে উঠতে থাকে জমির ধান। এখন সোনারঙা সেই ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত তারা।
জেলায় এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোপা-আমন মৌসুমে ধান ক্ষেতে তেমন একটা প্রভাব হানতে পারেনি। আর প্রকৃতির কাছে হার মেনে নেয় না এ জেলার কৃষকরা। প্রতি বছর বন্য অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোদমে জমিতে নেমে পড়েন তারা। জমিতে নতুন করে ফসল ফলান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ বছর বন্যায় যমুনা তীরবর্তী এই জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি নেই। চলতি মৌসুমে জেলায় এ বছর ধানে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। বগুড়ার কৃষকরা অতি যত্নের সঙ্গে তাদের ফসল চাষাবাদ করে থাকেন। চাষাবাদ করা জমিতে রোপণকাল থেকে কখনো নিড়ানি দিতে হয়। প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক দিতে হয় এবং পানির অভাব দেখা দিলে জমিতে সেচ দিতে হয়। যার কোনো কমতি রাখেন না তারা। বিগত রোপা আমনে উৎপাদিত ধানের ভালো দাম পাওয়ায় এবারও তারা মনে অনেকটা আনন্দ নিয়েই কষ্টকর কর্মযজ্ঞ চালিয়ে গেছেন।
বগুড়ার শেরপুর, নন্দীগ্রাম ও শাজাহানপুর উপজেলার মামুন মিয়া, জাকারিয়া জাকির, মিল্লাত হোসেনসহ একাধিক কৃষক জানান, ইতোমধ্যেই রোপা-আমন মৌসুমের ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এ বছর রোপা মৌসুমে তাদের উৎপাদিত ফসলের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। বর্তমানে ধানের দামটাও ভালো হওয়ায় তারা খুশি।
এ বছর সার, বীজ ও বালাইনাশকের সংকট তেমন ছিল না বললেই চলে। বিদ্যুতের সমস্যা হলেও বৃষ্টি হওয়ায় সমস্যা অনেকটা কেটে উঠেছেন কৃষক। ফলে ফসলের মাঠ অনেক সুন্দর হয়েছে। ধানের সবল-সতেজ চারা এবং শীষ হয়েছে। এবার ধানের ফলনও বাম্পার হয়েছে।
তারা বলেন, হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর পরিচর্যার মধ্যদিয়ে ফসল ফলান এ জেলার কৃষক। চোখের সামনেই তরতর করে বেড়ে উঠতে দেখেন জমির ধান। এখন সোনারঙা সেই ধান ঘরে তুলছেন। অনেকেই ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন। এখন বাজারে কাঁচা ধানই প্রতিমণ ১ হাজার ১শ থেকে ১ হাজার ২শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ধানের এমন দাম তাদের মতো কৃষকদের ব্যাপক আশাবাদী করে তুলেছে বলে মন্তব্য করেন তারা।
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার কৃষক শ্রী-নিতাই মণ্ডল জানান, এবার রোপা-আমন মৌসুমে তিনি প্রায় ১৮ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনদিন আগে থেকে ধান কাটা মাড়াইয়ের কাজ শুরু করেন তিনি। তার মোট আবাদের ৮ বিঘা জমির ধান কাটা মাড়াই শেষ হয়েছে। প্রতি বিঘায় ফলন হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ থেকে ১৮ মণ।
আবহাওয়া ভালো থাকলে আগামী এক সপ্তাহ পর পুরো জমির ধান ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি। তিনি তার পছন্দমত ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৭৫ ও রঞ্জিত জাতের ধান চাষাবাদ করেছেন। তার চাষাবাদের সেই ধান কাটতে শ্রমিকরা মাঠে ব্যস্ত রয়েছেন।
তিনি জানান, রংপুর জেলার একদল শ্রমিক প্রতিবছর তার জমির ফসল কাটা-মাড়াইয়ের কাজ করে থাকেন। এবার তাদের ১১ সদস্যের দলটি ইতোমধ্যে কাজ করছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পুরো জমির ধান কাটা সম্পন্ন করে এই এলাকার অন্যদের জমির কাজে হাত দেবেন তারা। প্রতি বিঘা জমির ধান কাটা-মাড়াইয়ে খরচ হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। ফসলি মাঠের দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে চুক্তি হয়ে থাকে বলেও জানান তিনি।
এদিকে রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা থেকে বগুড়ায় প্রতিবছর ধান কাটতে আসা জালাল উদ্দিন, সালাম মিয়াসহ একাধিক শ্রমিক জানান, প্রায় প্রতিবছরই তারা ১৫ থেকে ৩০ জনের একেকটি দল করে বগুড়ায় ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ করতে আসেন। ইতোমধ্যে তারা জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার কয়েকজন গৃহস্থের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বিঘা জমির ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ শেষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমির ধান কাটা-মাড়াইয়ে পারিশ্রমিক হিসেবে পাচ্ছেন ৩ হাজার ৫শ থেকে ৭শ টাকা পর্যন্ত। চুক্তিটা ফসলি মাঠের দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-সহকারী পরিচালক কৃষিবিদ মো. ফরিদুর রহমান জানান, বগুড়া জেলায় চলতি রোপা-আমন মৌসুমে ১২টি উপজেলায় ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৮২ হাজার ৫২০ হেক্টর জমি। চাষাবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে। জুলাই মাসের মধ্যবর্তী সময় থেকে কৃষকরা জমিতে এ ধান লাগিয়েছেন। অনেকে আগাম হিসেবে এর আগেও চাষাবাদ শুরু করেন। রোপণের সময়ের ওপরই ধান বা যে কোনো ফসলের বেড়ে ওঠা নির্ভর করেন।
তিনি জানান, এ বছর রোপা-আমন মৌসুমে চাষ করা ধানের মধ্যে রয়েছে ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৫১, ব্রি ধান-৭৫ ধান। এছাড়াও রঞ্জিত ও স্বর্ণা জাতের ধান বেশি চাষ করেছেন কৃষক। এসব জাতের ধানের ফলন ভালো হয়। এবার চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৩১৪ মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়েছে। জেলায় এ পর্যন্ত মোট চাষাবাদের ৫৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে।
ধানকাটা ও মাড়াইয়ের কাজ শেষ হলে আগামী কিছু দিনের মধ্যে কৃষকরা তাদের জমিতে একযোগে আলুর বীজ বপন করবেন। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে রোপা-আমন ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় খুশি এ জেলার কৃষক। কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য পাবে বলেও আশা করছেন কৃষি এ কর্মকর্তা।





























