
স্পিনিং বা সুতা শিল্পকে দেশের অর্থনীতির স্পন্দন বলা যায়। এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। যা দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে একক বৃহৎ বিনিয়োগ। টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল খাতের ৭০ শতাংশ কাঁচামালের যোগানদাতা স্পিনিং শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে।
প্রতিবেশী দেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে বন্ড সুবিধায় অবাধে আমদানি হচ্ছে সুতা। এর ফলে কমেছে স্থানীয় সুতার চাহিদা। মিলগুলোতে পড়ে আছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার অবিক্রিত সুতা। এরই মধ্যে বন্ধ হয়েছে ৬০টি কারখানা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সহ-সভাপতি সালেউদ জামান খান বলেছেন, লোকসানে সুতা বিক্রি করতে করতে গত দুই বছরে আমাদের স্পিনিং মিলগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। আমরা সরকারকে বারবার বলেছি যে আপনারা দেখেন, এটা সমাধান করেন। পার্শ্ববর্তী দেশ কিন্তু আমাদের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যাচ্ছে বস্ত্রখাতে। তারা তাদের পণ্যে প্রণোদনা দিয়ে বাংলাদেশে ডাম্পিং করতেছে, যাতে আমাদের এই খাত ধ্বংস হয়ে যায়।
এদিকে, দেশের স্পিনিং শিল্প ধ্বংস করতে স্পষ্ট হয়েছে নানাবিধ ষড়যন্ত্রের ছক। ভারতে ৩০ কাউন্টের এক কেজি সুতা উৎপাদন করতে ব্যয় হয় ২ দশমিক ৯৩ ডলার। দেশে উৎপাদিত এই সুতার দাম ২ দশমিক ৮৫ ডলার। কিন্তু সুতা শিল্পকে সুরক্ষায় ওই দেশের উদ্যোক্তাদের নানাবিধ সুবিধা দিয়েছে ভারত সরকার। এতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা পেয়ে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত দাম কমিয়ে রফতানি করছে পার্শ্ববর্তী দেশ। এতে হুমকির মুখে পড়েছে দেশীয় শিল্প। লাফিয়ে বাড়ছে আমদানি, রুগ্ন হচ্ছে স্থানীয় শিল্প।
বিটিএমএ'র পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজিব হায়দার বললেন, পার্শ্ববর্তী দেশ রফতানির ৪৮ ভাগ এই দেশে রফতানি করে। তাহলে একটা নির্দিষ্ট পণ্য একটি দেশের ওপর পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। যদি স্থানীয় মিলগুলো সক্ষমতা হারায়, তাহলে ওই দেশ যখন দেখবে যে, এই দেশে তাদের প্রতিযোগী হিসেবে বিকল্প শিল্প নাই, তখন অবস্থাটা কী হবে? এই দামে কি সুতা পাওয়া যাবে?
একক দেশ নির্ভরতা টিকিয়ে রাখতে চলছে নানা ষড়যন্ত্র। কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে বন্ড সুবিধায় আনা সুতা। শক্তিশালী হয়েছে সেই সিন্ডিকেটও। আবার ৪৫ বছর ধরে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বিদ্যমান। দীর্ঘ এই সময়ে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও শিল্প সুরক্ষায় তেমন দৃষ্টি দেয়নি বিগত সরকার।
সালেউদ জামান খান বললেন, বন্ডকে নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে দেশীয় শিল্প বড় হয়। আর ডিবন্ডিং করার কারণে যারা সত্যিকারের ব্যবসায়ী, যারা সুতা আমদানি করে রফতানি করে তাদের কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু যারা স্থানীয় বাজারে কালোবাজারি করে তাদের হয়তো একটু বেশি সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার বলেছেন, এই বন্ডের সুতা বিক্রি হচ্ছে, আর আমার মিলের সুতা গোড়াউনে পড়ে আছে। বিরাট একটা চক্র আছে, যারা এই বন্ডের সুতার অপব্যবহার করতেছে। ডিবন্ড যখন করবেন, তখন এই কাউন্টের সুতার বন্ড শুল্ক দিয়ে তাকে আমদানি করতে হবে। তাকে রফতানি করতে হবে শুল্ক ফেরত পাওয়ার জন্য। আর যদি রফতানি না করেন তাহলে শুল্ক ফেরত পাবে না। তাহলে যিনি ভিন্ন চিন্তা করে সুতাটা আনতো, তারটা কিন্তু বন্ধ হয়ে যাবে অটোমেটিক।
স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় সুতায় বন্ড সুবিধা বাতিল করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। সেই সুপারিশ কার্যকরে এনবিআরে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রনালয়। কিন্তু অদৃশ্য হস্তক্ষেপে কার্যকর হচ্ছে না সিদ্ধান্ত।






































