
গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য গরু-লাঙলের সঙ্গে কৃষকের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। খুব সকালে গোয়াল থেকে গরু বের করে গরুর মুখের সামনে খাবার দেওয়া হয়, খাবার শেষ করে লাগাম লাগিয়ে গরুকে প্রস্তুত করা হয় হাল চাষে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কৃষক ভোরে সামান্য কিছু খেয়ে গরু নিয়ে রওনা দেয় কাঙ্ক্ষিত জমির উদ্দেশে। যে গরুগুলো দিয়ে হাল চাষ করা হয় গ্রাম্য ভাষায় সেটাকে ‘হালের গরু বলে’। প্রতি গ্রামে দুই-একজনের হালের গরু থাকে, হাল চাষের আগেরদিন কৃষকেরা গরুর মালিকের কাছে তারিখ ও মূল্য ঠিক করে যায়। মূল্য ঠিক হলে পরের দিন সকালে জমিতে হাজির হয় হালের গরু ও তার মালিক। আলু তোলা শেষ হলে কিছুদিন পড়েই হাল চাষের প্রয়োজন পড়ে।
ভোরে শুরু হয় হাল চাষে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখির কিচিরমিচির শব্দে আর লাঙলের চারপাশে হরেক রকম পাখির আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠে ক্ষেত। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা মিলে ছোট্ট ছোট্ট ছেলে-মেয়ের, কারো হাতে ব্যাগ কারো হাতে পাতিল আবার কারো হাতে দেখা মিলে বেতের তৈরি কাঠা। মূলত তারা লাঙলের পেছনে থেকে মাটির নিচে ছাড়া পড়া আলু কুড়াতে এসেছে। বেলা বাড়লে তারা চলে যায় বাড়িতে কারণ তাদের আবার স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। আবার ছোট্ট শিশুরা আলু কুড়ানোর জন্য সেখানে থেকে যেতে চায় কিন্তু তাদের মা এসে তাদেরকে নিয়ে যায় তবে এটিও সঠিক যে ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা বড় হওয়ার পড়ে এ দৃশ্য স্মৃতিচারণ করবে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে।
যে হাল চাষ করে নেয় তাকে সকালের খাবার দিতে হয়। সে জন্য গেরস্তের (কৃষক) বাড়ি থেকে কেউ একজন গামছায় বেঁধে গামলা ভর্তি পান্তা, লবণ ও সঙ্গে কিছু তরকারি অথবা আলুর ভর্তা দিয়ে যায় নওগাঁর আঞ্চলিক ভাষায় যা ‘হাল বোয়া’ নামে পরিচিত। গেরস্তের বাড়ি থেকে আসা কেউ একজন খাওয়া শেষ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করে। পরে সেগুলো নিয়ে চলে যায়। প্রায় দুপুরের আগেই হাল চাষে শেষ হয়ে যায় বা আরেকটু দেরিতে। গেরস্তের বাড়িতে দুপুরের খাবার শেষ করে কিছু চাল নিয়ে রওনা দেয় নিজের বাড়ি। যে চাল গরুর মালিককে দেওয়া হয় সেটিকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘সিদা’ বলে। এভাবে গরু দিয়ে হাল চাষে করে সংসার চলে গরুর মালিক সেই কৃষকের।
গ্রামীণ প্রতিটি কৃষি পরিবারে ছিল ঐতিহ্যবাহী গরুর হাল। এখন যা আছে তবে সেটা আর কাজে লাগে না, শুধুই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রায় এক দশক আগেও খুব সকালে কাঁধে লাঙল-জোয়াল নিয়ে মাঠে যেতে দেখা যেত কৃষি পরিবারের লোকেদের। তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফসল ফলাতেন। জমিতে হাল চাষ শেষে সেই জমিতে দেওয়া হতো মই। আর মই দেওয়ার সময় কখনো আবার শিশুদের মইয়ের উপর বসানো হতো। আর শিশুদের জন্য সেই মুহূর্তটা ছিল এক আনন্দে ঘেরা মুহূর্ত। সেই দিনগুলো এখন শুধুই কল্পনায়। গ্রাম বাংলা থেকে গরুর হাল বিলুপ্তির প্রধান কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার।
গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ ও গোয়ালভরা গরু এসবই গ্রাম বাংলার কৃষকদের প্রাচীন ঐতিহ্য হলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের ফলে সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে। যা একটা সময় গিয়ে রূপকথার গল্পে মোড় নেবে। জনসংখ্য বৃদ্ধির ফলে দিনকে দিন কমে যাচ্ছে আবাদি জমি ও বসতভিটা। ফলে ভাটা পড়ছে গরু পালনে। ইচ্ছা থাকলেও গোয়াল ঘরের জায়গার অভাবে হয়ে উঠছে না আর গরু পালন।
এক সময় গরু ছাড়া কৃষিকাজ ছিল অসম্ভব যার কারণে কৃষকরা বাধ্য হয়েই গরু পালন করতো। এখন জমির স্বল্পতার কারণে গরু পালন ছেড়ে দিয়েছেন অনেক কৃষক। বর্তমানে পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টরের প্রচলনে হারিয়ে যেতে বসেছে গবাদিপশু দিয়ে হাল চাষে। এক সময় যে কোনো ফসল ফলানোর আগে গরু দিয়ে হাল চাষ করতেন কৃষক। কিন্তু এখন কৃষি ফসল ফলানোর জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হওয়ায় গরু দিয়ে হাল চাষ বিলুপ্তির পথে।
আগে হাল চাষে করতে অনেক কৃষক বাড়িতে গরু পালন করতেন। আবার অনেক কৃষক গরুর হালকে পেশা হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং তা দিয়েই সংসার চালাতো। যদিও গরু দিয়ে হাল চাষে সময় লাগলেও কৃষকরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গরুর হাল সংগ্রহ করতো। হালের গরু দিয়ে গরিব মানুষ তাদের পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতো। যেসব কৃষক গরু দিয়ে হাল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন কালের বিবর্তনে তারা পেশা হারিয়ে অন্য উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
এক সময় খণ্ড খণ্ড জমিতে হাল চাষের একমাত্র মাধ্যম ছিল গরুর হাল। এখন ঐসব জমিতে পাওয়ার ট্রিলার দিয়ে হাল চাষ করতে অনেক বেগ পেতে হয়। চাষাবাদে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার হওয়ায় ধীরে ধীরে গরুর হাল চাষ হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও অনেক কৃষক বাপ-দাদার এই গরুর হাল চাষ পদ্ধতি টিকিয়ে রেখেছেন। হয়তো ভবিষ্যতে প্রযুক্তির আরো ব্যবহারের ফলে গ্রাম বাংলা থেকে একেবারে হারিয়ে যাবে গরুর হাল চাষ পদ্ধতি। কৃষকরা এখন কৃষিকাজে ব্যবহার করছে পাওয়ার ট্রিলার, ট্রাক্টর, ধান মাড়াই মেশিন, ধানকাটা মেশিন, ধান লাগানো মেশিন, স্যার প্রয়োগের মেশিনসহ আধুনিক সব কৃষি যন্ত্রপাতি। কয়েক বছর আগেও গ্রামাঞ্চলে গরু দিয়ে হাল চাষ, ধান মাড়াই করা হতো। এখন সেই দৃশ্যগুলো আর চোখে পড়ে না। এখন আর কৃষকরা ভোরবেলা পান্তা ভাত খেয়ে লাঙল জোয়াল নিয়ে জমি চাষের উদ্দেশে বের হন না।
নওগাঁ সদর উপজেলার পার-নওগাঁ গ্রামের কৃষক আব্দুল গণি বলেন, গরু ও লাঙল এই দুটির মধ্যে যুগ যুগ ধরে নিবিড় সম্পর্ক আছে। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি যে, আমাদের বাবা-দাদারা প্রতিদিন সকালে গরু ও লাঙল নিয়ে বের হতেন জমি চাষ করার জন্য। আমাদের গোয়ালভরা গরু ছিল এক সময়। মূলত এই হালের কাজে ব্যবহার করার জন্যই গরু পালন করতেন। আসলে এখন এগুলো সোনালি অতীত। এখন আর হালের গরু বা হাল চাষ চোখেই পড়ে না।
কৃষক আব্দুল গণি আরো জানান, আমি নিজেই কয়েক বছর আগে হাল চাষ করেছি গরু দিয়ে। লাঙল পাশের বাজার থেকে আগে থেকেই কিনে আনতে হতো। এরপর সেটার সঙ্গে জোয়াল দেওয়া লাগতো, যেটা গরুর কাঁধে দেওয়া হতো। আমি আমার বাবার সঙ্গেও ক্ষেতে যেতাম ছোটবেলায়, বেলা হলে চলে আসতাম বাড়িতে।
কালের বিবর্তনে গ্রাম থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে লাঙল দিয়ে হাল চাষ। কৃষি প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটার ফলে এখন নিমিষেই কয়েক বিঘা জমি চাষ শেষ করা যায়।





























