
একসময়ের খরস্রোতা মহেশখালী দ্বীপের চার ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা কোহেলিয়া নদী এখন নাব্যতা হারিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে। অথচ প্রায় ২০ হাজার জেলে পরিবারের বসতি এই নদীকে ঘিরে। পূর্ব পুরুষদের আদি পেশাকে আঁকড়ে ধরেই এতদিন বেঁচে ছিল জেলে পরিবারগুলো। হঠাৎ করেই কোহেলিয়া নদীনির্ভর জেলেদের জীবনে দুঃসময় নেমে এসেছে।
মহেশখালী ডিজিটাল আইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের কালারমারছড়া, হোয়ানক, ধলঘাটা ও মাতারবাডি ইউনিয়নের ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষের নৌপথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল কোহেলিয়া নদী। বিশেষ করে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম শহর থেকে মালামাল পরিবহন ও মানুষের যাতায়াতের সহজ মাধ্যম ছিল এই নদী। নদীর দৈর্ঘ্য ১৬ কিলোমিটার কিন্তু গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কারণ, দেশের একমাত্র নদী এটি। এখানে মিঠাপানির মাছ পাওয়া যায় না। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী হওয়ায় এই নদীর পানি পূর্ণমাত্রায় গাঢ় লবণাক্ত।
এই নদী ছিল পোতাশ্রয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কিংবা সাইক্লোনের সময় বড়-ছোট নৌযান এই নদীতে আশ্রয় নিত। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের হ্যারিকেন বা প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের সময় এই নদীর ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট রক্ষা করেছিল অসংখ্য জানমাল। আবার নদীর পানি শাখা নদী বা খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লবণ চাষের পানির পূর্ণমাত্রায় যোগান দিয়ে থাকে। এই নদীর গুরুত্ব এ কারণেই এত বেশি যে, মহেশখালী চ্যানেল ও কুতুবদিয়া চ্যানেলের সঙ্গে এটি সরাসরি সংযুক্ত। অথচ কালের পরিক্রমায় এই নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।
কালারমারছড়া মোহাম্মদ শাহ ঘোনার বয়োবৃদ্ধ আবুল কাশেম সওদাগর এ প্রতিবেদককে বলেন,স্বাধীনতার পর আশি-নব্বইয়ের দশকের পুরো সময় তথা ২০০৫ সাল পর্যন্ত মহেশখালীর উত্তরাঞ্চলের মানুষের মালামাল পরিবহন ও যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল কোহেলিয়া নদীর নৌপথ। তখন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। নদীর গভীরতা ছিল ২০-৩০ ফুট আর নদীর এপার থেকে ওপারের দৈর্ঘ্য ছিল গড়ে ২ কিলোমিটার। এক পার থেকে অন্য পারের লোকজন দেখা যেত না। ফলে বড় বড় ট্রলার ও নৌযান চলাচল করত অনায়াসে। আর এ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত ২০-২৫ হাজার জেলে। অথচ আজকাল এমনই দশা হয়েছে যে, নদীতে জল নেই, তাই মাছও নেই। জেলেদের আয়ও নেই। আছে শুধু নদীর দুপারের ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ধ্বংস বা ভরাট ভূমি দখল করার অসম প্রতিযোগিতা।
নাব্যতা হারাতে হারাতে কয়েক বছরে অনেকটা মৃতপ্রায় প্রমত্তা কোহেলিয়া নদী। মাতারবাড়ির ডা. এয়াকুব আলী বলেন, বিশেষ করে ২০১৬ সালের পর থেকে বড় দাগে কোহেলিয়া নদীর দুপার দখল, দূষণ ও ভরাটের মহোৎসব শুরু হয়। বিশেষ করে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্রবন্দর, ইকোনমিকজোন থেকে শুরু করে বড় বড় মেঘা প্রকল্পের জন্য একচেটিয়া অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে। কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের বর্জ্য ও পলিমাটি সরাসরি নদীতে এনে ফেলানো হচ্ছে। যার কারণে নদী দ্রুত ভরাট হয়ে গেছে। আগে নদীতে জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত, এখন সেই মাছের দেখা নেই।
সরেজমিন দেখা যায়, সংসারের খরচ মেটাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে গেছেন এখানকার জেলেরা। তারা বাপ-দাদার পেশা হারিয়ে এখন যাযাবরের মতো জীবনযাপন করছেন। মাছ নেই, তাই বদলে গেছে তাদের পেশা। তাদের কেউ এখন জাহাজ শ্রমিক, কেউ দিনমজুর, কারো কোনো পেশাই নেই।
‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ মহেশখালী শাখার অন্যতম নেতা প্রবীণ সাংবাদিক ও গবেষক আবদুস ছালাম কাকলী বলেন, কোহেলিয়ার নদী অস্তিত্ব সংকটে পড়ায় জেলে পরিবারে হাহাকার চলছে। অনেক জেলে সীতাকুণ্ড গিয়ে জাহাজ ভাঙার কাজ নিয়েছে। এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণেই কোহেলিয়া ভরাট হয়ে এখানকার মানুষের জীবনে কষ্ট নেমে এসেছে। এখন নদীতে মাছ ও মাছের পোনা পাওয়া যায় না। নদীর বুক চিরে প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য ব্রিজ ও রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যা নদীর ঠিক মধ্যবর্তী পয়েন্ট ধরে। আরো উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সেই রাস্তা থেকে এখন আরো ২০০ মিটারের একটি জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে এমনিতে কোহেলিয়া নদী মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। এর ফলে নদী আরো দ্বিগুণ গতিতে ভরাট হচ্ছ। আর এই ভরাট ভূমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে প্রভাবশালীরা।
তিনি আরো বলেন, জেলেদের দুঃসময়ে স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধি সহযোগিতা করছেন না। প্রকৃত জেলেরা সরকারি সহযোগিতা থেকেও বঞ্চিত। আর নদী রক্ষায় স্থানীয়রা আন্দোলন করলেও নিশ্চুপ ভূমিকায় থাকে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকজন।
ধলঘাটা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল হাসান বলেন, পলি জমার কারণে কোহেলিয়া নদীতে ট্রলার ও নৌকা চলতে পারে না। মহেশখালীর মানুষের এসব দুঃখ-দুর্দশার কথা বলার জন্য ঢাকায় অনেক প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। ভূমি সচিবদের সঙ্গে বসেছিলাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমাদের এখনো আন্দোলন করতে হচ্ছে।
‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, কয়লা বিদ্যুতের নামে কিছু মানুষের সুবিধার্থে সরকার আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশকে ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কোহেলিয়া নদী ওই অঞ্চলের একটি বৃহৎ নদী। এই নদীকে কেন্দ্র করে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কিন্তু মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুবিধার্থে কোহেলিয়া নদীর বুক চিরে রাস্তা তৈরি করে নদীটি ধ্বংস করা হয়েছে। এভাবে প্রকল্পের নামে যদি নদী, জলাধার, প্রকৃতি, পরিবেশের তোয়াক্কা না করি, তবে আমরা একটি অন্তঃসারশূন্য জাতি তৈরি করব।
তার কথায় সুর মিলিয়ে ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ এর কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলছেন, আমার দেখা কোহেলিয়া নদী এভাবে নিচিহ্ন হয়ে যাবে, তা হতে দেওয়া যায় না। নদী খেকোদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।আর মানুষকে জাগানোর দায়িত্ব নিতে হবে পরিবেশ যোদ্ধাদের।
তিনি বলেন, কোহেলিয়া নদী নামটিই কতই সুন্দর। এই সুন্দর নদীটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটি অভাবনীয়। বিশ্বাস করার মতো নয়। এটি সরাসরি দেখে মনটা খুবই ভেঙে গেল। কীভাবে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে একটি নদী হত্যা করতে পারে! নদী একটি জীবন্ত সত্তা। নদী রক্ষায় সবাইকে প্রতিবাদ করতে হবে। কোহেলিয়া নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
তবে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু কালাম আজাদ বলেন, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে নদী ভরাট হচ্ছে না। রাস্তা নির্মাণ ও ব্রিজ তৈরির কারণে নদীতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। এছাড়া প্রকল্পের বর্জ্য ও পলি নদীতে আসার প্রশ্নই ওঠে না। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ কর্মী, নদী পাড়ের মানুষের দাবি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ যত সব মেগা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, সবই পরিবেশ বিধ্বংসী। তারা আরো বলেন, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মিথ্যাচার করছেন। তার বক্তব্য বাস্তবতা বিবর্জিত।
অপরদিকে, মাতারবাড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, কোহেলিয়া নদীকে বাঁচাতে খনন কাজ করা এবং নদীর সীমানা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।





























