
দেশের ভোজ্যতেলের সিংহভাগই উৎপাদন হয় রংপুর অঞ্চল থেকে। আর তা হয় সরিষা আবাদের মাধ্যমে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের এক অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, গত পাঁচ বছরে রংপুরে সরিষার আবাদ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। একইসাথে নতুন নতুন জাত সংযুক্তির কারণে বেড়েছে ফলনও। কৃষকরা বলছেন, অন্যান্য আবাদের চেয়ে সরিষায় কম খরচে অধিক লাভ।
আর এই সরিষার ফলন বৃদ্ধিতে শনিবার (১৮ জানুয়ারি) রংপুরের বদরগঞ্জে বারি সরিষা-২০ এর মাঠ দবিসের আয়োজন করে রংপুরের বুড়িরহাট আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. মনিরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন বুড়িরহাট আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কামরুল ইসলাম।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায় সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েক বছর আগেও পতিত পড়ে থাকা জমিতে আবাদ হচ্ছে নজর কাড়া সরিষার। বাতাসে হলুদিয়া ফুলের দোল আর মৌমাছির গুণ গুণ শব্দে বিমোহিত সবাই। মুগ্ধতা ছড়ানো এই সরিষা নিয়ে দীর্ঘ বছর ধরে গবেষণা করছে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের প্রধান ভোজ্য তেলবীজ ফসল সরিষা। গত বছর দেশে ১০ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে এই ফসল। চলতি বছর দশ লাখের বেশি জমিতে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সারাদেশের মধ্যে রংপুর বিভাগেই প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে আবাদ হচ্ছে এই ফসল।
কৃষকরা বলছেন, কম খরচে অধিক লাভজনক হওয়ায় সরিষা চাষে ঝুঁকছেন তারা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, সরিষার আবাদ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা- ১৭ ও বারি সরিষা-২০ নামে স্বল্পমেয়াদী চারটি উচ্চ ফলনশীর জাত উদ্ভাবন করেছে। এ জাতগুলোর জীবনকাল ৮০ থেকে ৮৫ দিন ও হেক্টর প্রতি বীজের ফলন দেড় থেকে দুই টন। আমন ধান কাটার পর এ জাতগুলো চাষ করে কৃষকরা বোরো ধানের চাষ করতে পারে। জাতগুলোর বীজের রং হলুদ বিধায় ৩ থেকে ৪ ভাগ তেল বেশী নিষ্কাশন করা যায়।
মনরিুল ইসলাম বলনে, জনপ্রতি প্রতিদিন ৩০ গ্রাম দৃশ্যমান তেলে খাবার দরকার। তাই তেলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ৭৫ থেকে ৮৫ দিনের উন্নত সরিষার জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যেগুলো সহজে আমন ধানের পর বোরো ধানের আগে এই মাঝামাঝি সময়ে চাষ করা যায়।
তিনি বলেন, রবি মৌসুমে মূলত সরিষার চাষ হয়ে থাকে। রবি মৌসুমে এদেশে সরিষা ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফসল যেমন- গম, ভুট্টা, আলু, ডালজাতীয় ফসল এবং শাক সবজির চাষ হয়ে থাকে। কাজেই সরিষার আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। তবে আগাম আমন ধান কর্তনের পর সেই জমিতে বোরো ধান চাষের পূর্বে স্বল্প মেয়াদী জাতের সরিষা আবাদ করে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
রংপুরের আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কামরুল ইসলাম বলেন, রংপুর অঞ্চলে তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গবেষণা ও উন্নত জাত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র।
তিনি বলেন, রংপুর অঞ্চলে ৩ লাখ হেক্টর দোফসলি ধানের জমি রয়েছে। যেগুলোতে বারি জাতের সরিষা অন্তর্ভুক্ত করে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। চলতি বছর রংপুর অঞ্চলে ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। আরও ২ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা গেলে ৩ থেকে ৪ লাখ টন সরিষা উৎপাদন করা সম্ভব। যেখান থেকে দেড় লাখ টন তেল পাওয়া যাবে। যা থেকে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা আমদানি ব্যয় কমানো যাবে।
কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের সমন্বয়ক রবিউল ইসলাম বলেন, তেল জাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির আওতায় উন্নত বারি সরিষার জাতসমূহ বিদ্যমান ফসল বিন্যাসে অন্তর্ভুক্তির গবেষণা এবং সম্প্রসারণ কার্যক্রম চলছে এবং এতে ভাল ফলন হয়েছে। অল্প খরচে বারি সরিষা আবাদে বেশি লাভবান হওয়া যায়।
কৃষি গবেষণা কেন্দ্র বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ২২ লাখ হেক্টর মৌসুমী পতিত জমি রয়েছে। অন্যদিকে ২০ লাখ হেক্টর জমি আছে যেগুলো আমন ও বোরোর মাঝামাঝি পতিত থাকে। এই জমিগুলোতে সরিষা আবাদ হলে এই ফলন বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে দেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি কমবে।
বিশেজ্ঞরা বলছেন, সরিষার উন্নত জাত, মানসম্পন্ন বীজ এবং উন্নত উৎপাদন কৌশল বিষয়ে কৃষদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।





























