
ইবি প্রতিনিধিঃপর্দানশীন নারীদের মৌলিক ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্দানশীন নারী শিক্ষার্থীরা। রবিবার (১৯ জানুয়ারি) বেলা ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এই মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেন তাঁরা।
এসময় পর্দানশীন নারীদের নাগরিকত্ব না দেওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ উল্লেখ করেন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পর্দানশীন নারীদের ১৬ বছর যাবত নাগরিকত্ব না দেওয়ার অভিযোগ তোলে শিক্ষার্থীরা। এসবের সাথে জড়িত স্বৈরাচারদের শাস্তির দাবি করেন পর্দানশীন নারী শিক্ষার্থীরা। এতে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
এসময় শিক্ষার্থীদের হাতে “পর্দানশীন নারীদের নাগরিকত্ব বঞ্চিত করা মানবতাবিরোধী অপরাধ।”, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মুখচ্ছবি দেখে পরিচয় যাচাই মূর্খতার লক্ষণ।”, “ছিঃ ইসি ছিঃ শুধুমাত্র পর্দা করার কারণে আমার নাগরিকত্ব কেড়ে নিলে?”, “আমার চেহারা আমি দেখাবো না, এটা আমার প্রাইভেসির অধিকার।”, “পরিচয় যাচাইয়ে ছবি দুর্নীতিবান্ধব, ফিঙ্গারপ্রিন্ট দুর্নীতিরোধক।”, “১৬ বছর পর্দানশীন নারীদের নাগরিকত্ব বঞ্চিত করা স্বৈরাচারীদের বিচার চাই।” সহ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা বলেন, “অসংখ্য পর্দানশীন নারী এখনও জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি যাদের পিতা-মাতা বাংলাদেশি এবং নিজেরাও বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন; শুধুমাত্র পরিপূর্ণ পর্দা করার কারণে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বঞ্চিত হয়ে আসছেন। গত ১৬ বছর যাবত ইসির সাবেক কতিপয় স্বৈরাচারী কর্মকর্তা শুধুমাত্র মুখচ্ছবি না তোলার অজুহাতে পর্দানশীন নারীকে নাগরিকত্ব আটকে রেখেছে। এতে পর্দানশীন নারীরা মৌলিক ও নাগরিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে নিদারুণ কষ্টে পতিত হয়েছেন। অনেক পর্দানশীন নারী অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন, কিন্তু এনআইডি ছাড়া ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত জমি বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছেন না। অনেক পর্দানশীন নারীর বাড়িঘর দুর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে গেছে, কিন্তু এনআইডি ছাড়া ত্রাণ নিতে পারছেন না। অনেক বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা পর্দানশীন নারী এনআইডির অভাবে বাসাভাড়া নিতে পারছেন না, বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করতে পারছেন না। পর্দার সাথে কোন চাকরি করে জীবন নির্বাহ করতে পারছেন না। গত ১৬ বছর যাবত ইসির সাবেক কতিপয় স্বৈরাচারী কর্মকর্তা পর্দানশীন নারীদের যে কষ্ট দিয়েছে, তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।”
শিক্ষার্থীরা আরো উল্লেখ করেন, “একজন নারী ছবি তুললে ২টি গুনাহ হয়। একটি ছবি তোলার গুনাহ, অন্যটি বেপর্দা হওয়ার গুনাহ। পর্দানশীন নারীরা সেই গুনাহ থেকে বাঁচতে চান। অথচ নাগরিকত্ব আটকে রেখে তাদেরকে গুনাহ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘন। আবার একজন পর্দানশীন নারী তার চেহারা কাউকে দেখাতে চান না, এটা তার প্রাইভেসির অধিকার। ফলে দুই দিক থেকেই পর্দানশীন নারীদের এ দাবী মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিলো বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। গত ১৬ বছর শুধুমাত্র পরিপূর্ণ পর্দা করার কারণে নারীদের সাথে যে বৈষম্য হয়েছে, আমরা তার সমাপ্তি চাই। অবিলম্বে পর্দানশীন নারীদের ধর্মীয় ও প্রাইভেসির অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে এনআইডি প্রদান করা হোক। এছাড়াও, এনআইডির মুখচ্ছবি পরিবর্তনযোগ্য। এতে প্রমাণিত হয়, মুখচ্ছবি পরিচয় যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম নয়। অথচ সেই মুখচ্ছবির অজুহাতেই পর্দানশীন নারীদের নাগরিকত্ব বঞ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া ছবি দিয়ে সনাক্তকরণ দুর্নীতিবান্ধব পদ্ধতি, অপরদিকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে সনাক্তকরণ দুর্নীতিরোধক পদ্ধতি। যেমন- আগে ব্যাংকগুলোতে ছবি দেখে পরিচয় যাচাইয়ের সময় এক ব্যক্তির একাধিক পরিচয়ে ঋণ উত্তোলন মত প্রতারণার ঘটনা ঘটে। এ প্রতারণা রুখতে বর্তমানে ব্যাংক ঋণ উত্তোলনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবার ছবি দেখে পরিচয় যাচাইয়ে একজন ব্যক্তির একাধিক এনআইডি তৈরির মত ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে দ্বৈত এনআইডির সমস্যাও দূর হয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে। আবার একটা সময় বাংলাদেশিদের সাথে চেহারার মিলকে পুঁজি করে প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ পাড়ি জমায়, কিন্তু যখনই তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে যাচাই শুরু হয়, তখনই রোহিঙ্গাদের প্রতারণা ধরা পড়ে এবং সমস্যার সমাধান হয়।”
পরিচয় নিবন্ধন আইন ২০১০ এবং ২০২৩-এ পরিচয় সনাক্তে চেহারার ছবির কথা উল্লেখ নাই জানিয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, বায়োমেট্রিক যাচাইয়ে ফেসিয়াল রিকগনিশনকেও বাধ্যতামূলক করা হয়নি, কিন্তু স্বৈরাচারী মনোভাব থেকেই পর্দানশীন নারীদের নাগরিকত্ব বঞ্চিত করে রেখেছিলো সাবেক ইসি কর্মকর্তারা। পর্দানশীন নারীরা চান, নতুন ইসি কর্মকর্তারা আর সেই পথে না হাঁটুক। পর্দানশীন নারীদের ধর্মীয় ও প্রাইভেসির অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখেই অবিলম্বে তাদের এনআইডি প্রদান করুক।
পর্দানশীন নারীদের পেশকৃত তিনটি দাবি, বিগত ১৬ বছরে যে সমস্ত সাবেক ইসি কর্মকর্তা পর্দানশীন নারীদের মানবাধিকার হরণ করেছে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা; ধর্মীয় ও প্রাইভেসির অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখেই অবিলম্বে এনআইডি প্রদান এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিতে মহিলা অফিস সহকারী বাধ্যতামূলক করা।





























