
দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা মহানগরের তরুণ নেতৃত্ব বেছে নিল বিএনপি। বয়স্ক ও প্রভাবশালী নেতাদের সাইড বেঞ্চে বসিয়ে তরুণদের সামনে আনার কারণ হিসেবে ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতাকে বড় করে দেখা হচ্ছে। সামনে সরকার পতনের বড় আন্দোলনে এ তরুণ নেতৃত্ব পলায়নপর হবে না, ঝুঁকি নিয়ে নেতৃত্ব দেবে- এমন ভরসায় তাদের বেছে নিয়েছে হাইকমান্ড।
ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ মহানগরে বিএনপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালামসহ দলের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন নেতা। উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়েছে সাইফুল ইসলাম নিরবকে। আগের কমিটির সদস্য সচিব আমিনুল হক নতুন কমিটিতে একই পদ পেয়েছেন। তিনি জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি ছিলেন। ভেঙে দেওয়া আগের কমিটিতে আহ্বায়ক ছিলেন আমানউল্লাহ আমান। তাকে ওই পদে বহাল রেখেই ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক করা হয়েছিল ফরহাদ হালিম ডোনারকে।
তাদের দুজনের কাউকেই ঢাকা উত্তর বিএনপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হয়নি। দক্ষিণে আহ্বায়কের পদ পেয়েছেন রফিকুল আলম মজনু। তিনি আগের কমিটিতে সদস্য সচিব ছিলেন। আগের কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক তানভীর আহমেদ রবিনকে এখন সদস্য সচিব করা হয়েছে। ভেঙে দেওয়া আগের কমিটিতে আহ্বায়ক ছিলেন আবদুস সালাম।
রোববার কমিটি দেওয়ার পর থেকে অন্তত ডজনখানে নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা একইসঙ্গে হতাশা ও প্রত্যাশার কথা জানান। বেশিরভাগই নাম প্রকাশ করতে চাননি।
আগের কমিটির দক্ষিণের এক যুগ্ম আহ্বায়ক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, একসময় ঢাকা মহানগরের নেতৃত্বে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে ভারসাম্য ছিল। এবার সবাই অপেক্ষাকৃত তরুণ। গত আন্দোলনে তাদের ভূমিকা নিয়ে বেশ প্রশ্ন-বিতর্ক আছে। তারা কারাগারে থাকাকালে তাদের কর্মী-অনুসারীরা নিষ্প্রভ ছিল। জনাবিশেকের একটি মিছিল পর্যন্ত তাদের অনুসারীরা করেনি।
এই নেতা নিজেও দক্ষিণের সদস্য সচিব হওয়ার দাবিদার ছিলেন। সেখানে সদস্য সচিব হয়েছেন তানভীর আহমেদ রবিন। তার ভূমিকার সমালোচনা করে এই নেতা বলেন, রবিনের ভূমিকা কী ছিল আন্দোলনে? বাবার ছায়ায় সামনে চলে এসেছেন। তার চেয়ে অনেক পোড় খাওয়া, প্রৌঢ় নেতা মহানগরে রয়েছে। তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণের আরেক নেতা ও একটি থানার সভাপতি বলেন, সিন্ডিকেট বলয় থেকে বের হতে পারেনি এবারও। একসময় সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাস বলয় থেকে নেতৃত্ব থাকত। এবার একচেটিয়া নেতৃত্ব এসেছে আব্বাস বলয় থেকে। আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব উভয়ই আব্বাসের অনুসারী। বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন নেতৃত্বে আসার জোর দাবিদার ছিলেন। বয়সে তরুণ, সাহসী সংগঠক হিসেবে তাকে সামনে আনা যেত। হয়তো গত আন্দোলনে বাইডেনের কথিত উপদেষ্টার মিয়া আরেফির ঘটনায় তিনি বাদ পড়েছেন। কিন্তু আবদুস সালামকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। আন্দোলনে ব্যর্থ হলে তো আগের কমিটির সদস্য সচিবচের ওপরও দায় পড়ে। দেশে গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছি; দুঃখজনক হলেও সত্য, নিজ দলেই এ দুটি অনুপস্থিত।
উত্তরের একজন নেতা বলেন, আহ্বায়ক নিরব ও সদস্য সচিব আমিনুল সম্পর্কে চাচাতো ভাই। তাদের বাড়ি ভোলায়। আমিনুলের নেতৃত্ব আমরা দেখেছি। মাঠে কতটা পেরেছেন তার হিসাব সবার কাছে আছে। তাকে আবারও একই দায়িত্বে রাখা হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মহানগর বিএনপির সাবেক নেতা শেখ রবিউল আলম রবি বলেন, সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও করণীয়সহ অনেক কিছু বিবেচনা করেই মহানগরের নেতৃত্ব ঠিক করা হয়েছে। আশা করছি, তারা নিজেরা প্রথমে ঝুঁকি নেবেন, অন্যকেও ঝুঁকি নিতে উদ্বুদ্ধ করবেন। আন্দোলনের কঠিন সময়ে ঝুঁকি নেওয়াই তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণদের উজ্জীবিত করতে হবে, বয়স্কদের পরামর্শ নিয়ে মাঠ গোছাতে হবে। এখানে অনেক হতাশা-ক্ষোভ থাকবে; এখন সবাইকে এক করাই তাদের মূল কাজ হবে। তিনি বলেন, সময়ের পরিক্রমায় এখন ঢাকায় ভিন্ন ধারার রাজনীতি সৃষ্টি করতে হবে। রিপ্রেজেন্টেবল রাজনীতি করতে হবে। নেতাকর্মীদের কাছে শুধু গ্রহণযোগ্য হলেই হবে না। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। সবার সঙ্গে একটি মিথষ্ক্রিয়া তৈরি করতে হবে।
কয়েকজন নেতা মনে করছেন, সরকারের এ দমন-পীড়নের পরিস্থিতির মধ্যে আন্দোলনে শতভাগ সফল হওয়াটাও এখন কঠিন। সময়ই বলে দেবে এ নেতৃত্বটা কতটা সফল ও কার্যকর হলো। তবে ঝুঁকির শপথ তো নিতে হবে।
তৃণমূলের রাজনীতিতে জড়িত টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ ফরহাদ ইকবাল মনে করেন, ঢাকায় ফলপ্রসূ আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে কোনো লাভই নেই। সারা টাঙ্গাইল জেলা অচল করে কী হবে; ঢাকা সচল থাকলে। এ জন্য ঢাকার নেতৃত্ব হবে সংগঠন-নির্ভর। সমরে লড়াই করতে হবে। রাজপথে লড়াকু নেতৃত্ব দিতে হবে।
মহানগরে নতুন কমিটি সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মঈন খান বলেন, সবকিছু দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব আস্থার প্রতিফলন ঘটাবেন সেই প্রত্যাশা রয়েছে।
ঢাকা মহানগর উত্তরের নব নির্বাচিত বিএনপির সদস্য সচিব মো. আমিনুল হক বলেন, গত কমিটিতেও দায়িত্বে ছিলাম। অভিজ্ঞতা তো আছেই। আমরা সবাইকে নিয়ে সামনে এগোতে চাই। সংগঠনকে ওয়ার্ড থেকে শক্তিশালী করা হবে। যারা রাজপথে টিকে থাকতে পারবেন তাদের ওয়ার্ড-থানা কমিটিতে মূল্যায়ন করা হবে। পর্যায়ক্রমে মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিট কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
আর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু বলেন, থানা, ওয়ার্ড ও অঞ্চলভিত্তিক কার্যক্রম চলছে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে নিয়মিত। আমরা খুব দ্রুত সাংগঠনিক কার্যক্রম গুছিয়ে রাজপথের কর্মসূচিতে যাব।
গত ১৩ জুন মধ্যরাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঢাকার দুই মহানগরের আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দেয় বিএনপি।







































